যারা আমার কুয়েট নিয়ে স্মৃতিচারণের প্রথম ব্লগটি পড়েছেন, তারা ভেবেছেন অনেক দ্রুত গিয়েছি। এর একটি কারণ ছিল, শুরুতে আমাদের নিজেদের মাঝে অনেক দুরত্ব ছিল। যার ফলে বলার মত তেমন কিছু ছিলনা প্রথম ৬ মাসে। পরে ধীরে ধীরে যখন আমরা কিছুটা এক-অপরের কাছাকাছি আসতে শুরু করি, তখন গল্প বলার মত কিছু ঘটনা ঘটে যায়। তবে তার মাঝেও কিছুটা সমস্যা ছিল, কারণ তখনও আমরা ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত ছিলাম। যার ফলে সেই কথা গুলো বললে বেশির ভাগ মানুষই বুঝতে পারবে না। এই সমস্যা কিছুটা দূর হয়, কুয়েট বায়োমেডিক্যাল এসোসিয়েশনের নির্বাচনের পর। আর করোনার লক-ডাউনের মাঝে পুরোপুরি দূর হয়ে যায়।
আগের পর্বে প্রথম বর্ষের কথা গুলো বলার চেষ্টা করেছি। এবার শুরু করব দ্বিতীয় বর্ষ থেকে। আমাদের ২-১ এর ক্লাস শুরু হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তখন দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস গুলো হত, এখন বর্তমানে কম্পিউটার ল্যাব যেখানে ওই যায়গায়। ক্লাস আমাদের খুবই সাধারণ ভাবেই হত। মানে বলার মত কিছু না। ডেইলি ক্লাসে যাই, স্যাররা লেকচার দেয়, কিছু স্টুডেন্ট সেই লেকচার তুলে এরপর চলে আসি। আমাদের একাডেমিক লাইফ ছিল একবারে ছকে বাধা। লেকচারের কথা যেহেতু উঠেছেই তাই একটা কথা বলে নেওয়া যায়। আমি এবং আমার মত অনেকেই ক্লাসের লেকচার তুলতাম না। কারণ ফাহিম সব লেকচার, বই-এ যেভাবে টাইপ করে লিখা হয় ওই ভাবে, তুলে নিত। এরপর সে এক্সামের আগে নিজে পিডিএফ করে সবাইকে দিয়ে দিত। এমনকি সিটির রুটিন দিলে, সিটির সিলেবাস টূকু আলাদা করে পিডিএফ দিত আমাদের। এই কাজটা ফাহিম ৪ বছর টানা করেছে। ওর কাছে কখনো লেকচার খাতা চাইতে হত না, তার আগেই পিডিএফ করে গ্রুপে দিয়ে দিত। এই কথাটা বলার কারণ, অনেক ব্যাচেই দেখতাম (আর এখন শুনি) কেউ কাউকে হেল্প করতে চায় না। এসব করে আসলে খুব একটা লাভ নেই।
তবে একাডেমিক জীবনে একগুঁয়েমি থাকলেও, নিজেরা বেশ মজাতেই ছিলাম। এই মজা বুঝাতে হলে আগে বলতে হবে আমরা তখন কে কোথায় থাকতাম। আমাদের আগের RS মঞ্জিলের গ্রুপ, ওখানেই ছিলাম। ওখানেই ছিলাম বলতে, RS মঞ্জিলে থাকত রাশেদ, রিফাত আর আজমাইন। আর বাইরে থেকে আমি আর পিয়াস যেতাম। তবে সাজ্জাদ, মেফতা, ফাহিম, স্মরণ, সিফাত, আরিয়ান, অভিষেক এরা প্রথম বর্ষে আলাদা আলাদা থাকলেও এরা দ্বিতীয় বর্ষের শুরুর আগে আগে সবাই এক বাসায় চলে আসে। এর ফলে ওদের একটা বড় সার্কেল হয়ে যায়। আর বাকি ছেলেরা একজন বা দুইজন এক সাথে এইভাবে ছিল। আর আমাদের ব্যাচের মেয়েরা প্রায় সবাই রোকেয়া হলেই থাকত (খুলনার স্থানীয়রা বাদে)।
উপরের আলোচনা থেকে এটা বুঝে গেছেন, যে আমাদের ব্যাচে দুটা বড় বড় সার্কেল ছিল। আমাদেরটা আর মেফতাদেরটা। আমাদের মাঝে সরাসরি কোন সমস্যা না থাকলেও, হালকা দুরত্ব ছিল। এভাবেই চলে প্রথম কিছুদিন। আমরা আমাদের মত ঘুরে বেড়াই, ওরা ওদের মত। দেখা হলে কথা হয়। এই পর্যন্তই। তবে আমাদের যাতায়াত ছিল উভয়ের বাসায়। কম বেশি ওরাও আসত, আমরাও যেতাম। এই স্থিতাবস্থার অবসান হয় বায়োমেডিক্যাল এসোসিয়েশনের নির্বাচনের সময়।
নির্বাচন
কুয়েটে প্রতিটা ডিপার্টমেন্টেই ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। এদের কাজ, একাডেমিক কাজের বাইরে যে কাজ গুলো আছে, যেমনঃ ডিপার্টমেন্ট ওরিয়েন্টশন, স্টাডি ট্যুর, র্যাগ ট্যুর, ইনডোর গেমস আয়োজন করা। এই ছাত্র প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়, ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে থাকা এসোসিয়েশনের জন্য। তবে এই কমিটির আকার-কাঠামো-নির্বাচনের ধরণ ডিপার্টমেন্ট অনুযায়ী আলাদা। আমাদের ডিপার্টমেন্টে ৩ টা পোস্টের জন্য ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়।
ভাইস-প্রেসিডেন্ট (৪র্থ বর্ষ থেকে)
জেনারেল সেক্রেটারি (৩য় বর্ষ থেকে)
এসিসট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি (২য় বর্ষ থেকে)
যেহেতু আমরা ২য় বর্ষে তখন, তাই আমাদের ভেতর থেকে এসিসট্যান্ট জেনারেল সেক্রেটারি (এজিএস) নির্বাচিত হবে। আমাদের সময় এসব ছাত্র প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হত, ২য়-৪র্থ বর্ষের সবার ভোটে। মানে সবাই মোট ৩টা ভোট দিত (প্রতি পদের বিপরীতে একটি করে)। এর ফলে মজার এক কাহিনি হত। জুনিয়রদের, সিনিয়রদের কাছে গিয়ে ভোট চাইতে হত। আবার সিনিয়রদের এসে জুনিয়রদের কাছে ভোট চাইতে হত।
আমাদের ব্যাচ থেকে এজিএস পদের জন্য দুইজন দাঁড়িয়ে যায়। অন্য ব্যাচ গুলার পোস্টেও দেখা যায় দুইজন করে দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের ব্যাচের দুইজন ছিল অভিষেক আর জয় পালমা। অভিষেক, পালমার তুলনায় একটু এগিয়ে ছিল নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে থেকেই। এর কারণও অবশ্য রয়েছে। উপরওয়ালা মানুষকে নানারকম গুণ দিয়ে পাঠায়। অভিষেকের সব থেকে বড় গুণ ছিল, ও বড় ভাইদের আনন্দ চিত্তে তেল মর্দন করতে পারত। এরফলে ১ম বর্ষ শেষ হওয়ার আগেই বেশির ভাগ সিনিয়ররা ওকে চিনত (সিনিয়র আপুরা বাদে)। আর যেহেতু অভিষেক ১ম বর্ষের শেষের দিকে মেফতাদের সাথে উঠে গেছে, তাই ওদের ভোট গুলোও পেয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল।
তবে যেহেতু প্রার্থী আরেকজন আছে (জয় পালমা), তার মানে ওর পক্ষের লোকও আছে। ওরাও ওদের যায়গায় থেকে চেষ্টা করতে শুরু করে। এভাবেই চলতে থাকে। এর মাঝে আমরা RS মঞ্জিলের যারা ছিলাম, এরা শুরুতে ছিলাম পুরাপুরি Non-aligned। কোন পক্ষেই নেই আপাতত। তবে কিছু দিন পর আমরা কয়েকজন ঠিক করলাম অভিষেককেই ভোট দিব। তবে আমাদের মাঝে এক-দুই জন অভিষেককে দুই চোখে দেখতে পারত না। এর কারণও অবশ্য ছিল। শুরুর দিকে এসে ওই এমন কিছু কাজ করেছে যার কারণে এই রাগ টা ছিল। পরে অবশ্য অভিষেক আমাদের অনেক ভালো বন্ধু হয়ে গেছে। কিন্তু ওই সময়ে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। সে যাই হোক, এই অভিষেককে ভোট দেওয়ার কারণে ওদের বাসার লোকজনদের সাথে আমাদের যোগাযোগ অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। এই যে যোগাযোগটা তৈরি হয়, পরে তা শুধু বৃদ্ধিই পেয়েছে। পরে ২০২১ সালের শেষে গিয়ে আমরা দুই বাসার সবাই মিলে একটা বাসায় গিয়ে উঠি। ততদিনে আর আলাদা সার্কেল বলে আর কিছু ছিল না।
ও আরেকটা কথা, নির্বাচনে অভিষেক জিতে যায়। তবে ব্যবধান খুবই কম ছিল। ১০-১২ ভোট হবে (সঠিক মনে নাই)। এর কারণ ছেলেদের ভোট মোটামুটি জোগাড় করতে পারলেও, মেয়েদের ভোট একদমই পায়নি অভিষেক।
COVID -19
কোভিড-১৯ বা করোনা, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আবিষ্কৃত হলেও, এর প্রাদুর্ভাব বিশ্ববাসী প্রথম অনুভব করে ২০২০ এর জানুয়ারিতে এসে। আর বাংলাদেশের মানুষের সাথে এর পরিচয় হয় মার্চ মাসে এসে। ফেব্রায়রি থেকে মার্চ মাস পর্যন্তই আমাদের ২-১ এর ক্লাস চলেছে ক্যাম্পাসে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি এসে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার। এরপরও আমরা কয়েকদিন ক্যাম্পাসে ছিলাম। তবে চলে যাওয়ার আগে আমরা সবাই তায়েফ-জামিলদের বাসায় গরু রান্না করে এক সাথে খাওয়া দাওয়া করি। এরপর যে যার বাড়িতে চলে যাই।

বাসায় গিয়ে যে যার মতই সময় কাটাচ্ছিলাম। যেহেতু ছুটিটা হুট করে দিয়েছে, আমরা তাই মোটামুটি কোন প্রস্তুতি ছাড়াই বাড়ি চলে যাই। আমরা ভেবেছিলাম বড় জোর ১-২ সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর ভার্সিটি খুলে দিবে। আর খুব বেশি হলে রোজার ঈদের পর ১০০% খুলে দিবে। কিন্তু আমাদের এই ভুল ভাঙতে বেশি দিন সময় লাগেনি। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত, হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়ার পর, আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম সহজে ভার্সিটি খুলছে না।
একটি ঝামেলা
বাসায় বসে থাকতে থাকতে, এক বন্ধুর আইডিয়া এলো অন-লাইনে গেম খেলা আয়োজন করার (সারা দিন শুয়ে-বসে থাকলে যা হয় আর কি)। ডিপার্টমেন্টের সবাই অংশগ্রহণ করবে এই খেলা গুলোয়। এই ভাবে একটা আয়োজন সফল ভাবে নামার পর, আরেকটা শুরু হয়। এই আয়োজনেই বিরাট এক ঘাপলা হয়ে যায়। ঝামেলা বাধে, যে মুল আয়োজন পরিচালনা করছে তার সাথে। আর অপর পক্ষের যিনি ছিলেন, সে আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র। এখানে নাম নিচ্ছি না, কারণ এতদিন পর এসে আসলে ওই ঝামেলা বা রাগ ধরে কেউ বসে নেই। তাই এসব নিয়ে বেশি ঘাটাঘাটি না করাই ভালো। সে যাই হোক, মূলত কিছু কারণে ঐ ব্যাচের উপর আমাদের রাগ ছিল তীব্র। তাই ঝামেলা হওয়ার পর সবাই যখন একপক্ষের কাহিনি জানতে পারি, তখন মনে হয় দোষ ঐ সিনিয়রেরই বেশি ছিল। যার ফলে সবাই এক হয়ে পাবলিকলি একটা পোস্ট দিয়ে ফেলি আমরা। ওরাও আমাদের নিয়ে একটা পোস্ট দেয়। এরপর সব থেকে সিনিয়র ব্যাচ থেকে সব পোস্ট ডিলিট করে দিয়ে, ঐ খেলাধুলার সমাপ্তি টানা হয়।
এই কাহিনিটার মাঝে ঘটে যায় ছোট্ট একটা ঘটনা। আমাদের ব্যাচের যার সাথে ঝামেলা হয়েছিল, ওই সব ইনফো শেয়ার করার জন্য RS মঞ্জিলের আর মেফতাদের বাসার কয়েকজনকে নিয়ে একটা ফেসবুক গ্রুপ খুলে। ওই গ্রুপটা ৬ বছর পর এখনো আছে। আশা করি সামনেও চলবে। এরপর থেকে আমরা যা করেছি, সব এক সাথে করেছি। তবে বিগত ৬ বছরে এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যায় কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে। তবে ২০২৩ সালের পর থেকে সদস্য সংখ্যা অপরিবর্তিত। আরেকটা মজার বিষয় হচ্ছে, যে ওই গ্রুপটা খুলেছিল, ওই এখন নাই গ্রুপটাতে। আমাদের উপর রাগ করে চলে গিয়েছিল। আমরাও আর ডাকিনি। কেউ চলে যেতে চাইলে মাঝে মাঝে চলে যেতে দিতে হয়।
ইংরেজিতে একটা সুন্দর কথা আছে, every cloud has a silver lining। এই ঝামেলাটার ভালো দিকটা হচ্ছে, আমাদের সবাই এক ছাতার নিচে চলে আসা। এরপর যে কত মজা করেছি একসাথে, তার হিসাব নেই। আর সিনিয়রদের সাথের ঝামেলাও করোনার পর আস্তে আস্তে একবারে নাই হয়ে গেছে। কোন পক্ষই জিনিসটাকে নিয়ে “গোঁ” ধরে বসে থাকেনি।
অন-লাইন ক্লাসের দিন গুলি
বাসায় যাওয়ার পরদিনই দেখলাম, আমার বাম চোখটা লাল হয়ে গেছে। ডাক্তারের কাছে গেলাম। কিছু ঔষধ দিল। কাজের কাজ ত কিছুই হলো না, কয়দিন পর থেকে বাম চোখে হালকা ঝাপসা দেখা শুরু করলাম। তার কিছুদিন পর দেখলাম চোখের নিচের পাতার ভিতরের দিকে একটা গুটির মত হয়েছে। এভাবেই শুরু হয় আমার লক-ডাউনের ছুটি। চোখের এইসব ঝামেলা নিয়েও, সারা দিন ফোন চালাতাম। করার ত কিছুই নেই। এত ফোন চালানোর ফলে চোখে আরও ঝাপসা দেখা শুরু করলাম। এর কিছু দিন পরই, ওই ঝামেলাটা হয়। তারপর থেকে নতুন গ্রুপে সারাদিন মেসেজিং চলত। আর রাত নেমে এলে শুরু হতো গ্রুপ কল। রাত ১২ টার সময় শুরু হতো, সকাল ৪-৫ টা পর্যন্ত চলত। কেউ না কেউ থাকতই।
এভাবে চলতে চলতেই কুয়েট থেকে নোটিশ জারি করল, অন-লাইনে ক্লাস নিবে। ক্লাস কিভাবে নিবে, কখন নিবে সব কিছুর ডিটেইলস মেইল করল কুয়েট কতৃপক্ষ। এরপরই বেঁকে বসল, আমাদের সকল স্টুডেন্টরা। কারণ, সবার বাসা ত শহরে না। তাই নেটওয়ার্কের সমস্যা আছে। প্লাস সবার ভালো ডিভাইস নেই ক্লাস করার মত। এর সমাধান না করা পর্যন্ত ক্লাস নেওয়া যাবে না। কুয়েট কতৃপক্ষও, কিছুদিন সময় নিয়ে, ১০ হাজার টাকার এককালীন লোনের ব্যবস্থা করলো। আর কিছু মোবাইল কোম্পানির সাথে চুক্তি করল, যেন সুলভ মূল্যে ডাটা কিনতে পারে কুয়েটের শিক্ষার্থীরা। এরপর ধীরে ধীরে ক্লাস শুরু হলো।
বাংলাদেশের অনেক সরকারি ভার্সিটি থেকেই Edu মেইল সরবারহ করে। কুয়েট থেকেও করত ১৫ ব্যাচ থেকে। কিন্তু করোনার আগ পর্যন্ত এই মেইলের তেমন ব্যবহার দেখিনি আমি। আমার মনে আছে, আমাদের ৩০ জনের মাঝে মাত্র ৩ জন এর এক্সেস নিয়ে এসেছিলাম। অনেকে জানতই না এটা আছে। অন-লাইন ক্লাস শুরুর পর এই মেইলের ব্যপক ব্যবহার শুরু হয়। গুগল ক্লাসরুম, ঝুম (zoom meeting), গুগল ফর্ম সব কিছুতেই কুয়েট মেইলের ব্যবহার শুরু হয়ে যায়। তবে এত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে সব থেকে বেশি ভ্যাবাচ্যাকা খায়, কুয়েটের কিছু শিক্ষক।
একটা উদাহারণ দিলেই বুঝতে পারবেন। কুয়েট কতৃপক্ষ, BdRen এর সাথে একটা চুক্তি করে ঝুম (zoom) এর প্রিমিয়াম ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছিল, কুয়েটের টিচারদের জন্য। যেন তারা সহজে ক্লাস গুলো নিতে পারে। কারণ “ঝুম”-এর ফ্রি ভার্সনে ৪০ এর মিনিটের বেশি মিটিং করার সুযোগ ছিল না। প্রায় সব টিচার এটা ব্যবহার করতে পারলেও, আমাদের সদ্য জাপান থেকে পিএইচডি করা টিচার এটা ব্যবহার করতে পারছিল না। তাই সে ফ্রি ভার্সনেই ক্লাস নিত। এতেও সমস্যা নাই। সমস্যাটা ছিল অন্য যায়গায়। যেহেতু আমাদের ক্লাস ছিল ৫০ মিনিট করে, তাই তাকে দুইবার লিংক দিতে হত। দেখা যেত সকাল ৮ টার ক্লাসের প্রথম ৪০ মিনিটে তার ক্লাসে থাকত ৩-৪ জন, কিন্তু দ্বিতীয় মিটিং শুরু হওয়ার পর একবারে ২৫+ জন হয়ে যেত ক্লাসে। আর স্যার যেহেতু সব সময় ক্লাসের শেষেই প্রেজেন্ট নিত, তাই কারো প্রেজেন্ট মিস হওয়ারও সুযোগ ছিল না।
অন-লাইন ক্লাসে আমি কখনোই মনযোগ দিতে পারিনি। ফোনে জয়েন করে, অন্য কাজ করতাম। লেকচার ত ফাহিম তুলছেই!! শুধু মাত্র প্রেজেন্ট নেওয়ার সময় একবার কথা বলতাম। এভাবেই চলতে থাকে আমাদের অন-লাইন ক্লাস।
BME BOSS
করোনা-র সময় প্রথম মিনিংফুল একটা কাজ ছিল এটা। এটা একটা বেসিক টেলিগ্রাম চ্যাটবট ছিল। কুয়েটের প্রতিটা কোর্সের আলাদা একটা কোর্স কোড থাকে। যেমনঃ BME 1101। এই কোর্স কোড দিয়ে মেসেজ দিলেই, একটা গুগল ড্রাইভের লিংক রিপ্লাই দিত। এই ড্রাইভ গুলো ছিল মুলত ১৫ ব্যাচের। তারা বেশ সুন্দর গোছানো একটা ড্রাইভ রেখেছিল। আমি শুধু ওই লিংক সেন্ড করে দিতাম। এটায় শুধু বিএমইর কোর্স ম্যাটারিয়াল পাওয়া যেত।
এই চ্যাটবটটার কথা প্রথম তায়েফ আমাকে বলে। ওই এসে প্রথম বুটেক্সের একটা চ্যাট বট দেখায়, পরে বলে এমন বানানো যায় নাকি। আমি পরে খুঁজে একটা সিস্টেম বের করি। এরপর শুধু ডাটা ইনপুটের ব্যবস্থা করা। আমি শুধু একাডেমিক ডাটা গুলো ইনপুট দিয়েছিলাম, আর তায়েফ কমন কিছু প্রশ্নের উত্তর ইনপুট দিয়েছিল।
এই চ্যাটবটে ডাইনামিক কিছু ছিল না। সবই হার্ড কোডেড। যার ফলে কোন চেঞ্জ করতে হলে, নিজে থেকে ইনপুট দিতে হত। প্রথমে এটিকে শুধু টেলিগ্রামের সাথে কানেক্ট করা হয়েছিল। ফেসবুকে কিভাবে কানেক্ট করে তার আইডিয়া তখন আমাদের কারোর কাছেই ছিল না। বেশ কিছুদিন পর, আমি ইউটিউব দেখে সিস্টেমটা বের করেছিলাম। তারপর সেটাকে ফেসবুকে কানেক্ট করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন এটার পিছনে আর কোন সময় আমরা ব্যয় করিনি। পরে আমি নিজে আরেকটা চ্যাটবটের কাজে হাত দেই। তখন এটার দরকার একেবারে শেষ হয়ে যায়।

রংপুর
আমার বড় বোনের শ্বশুড় বাড়ি রংপুর। ওর যখন দ্বিতীয় সন্তানের ডেলিভারির সময় কাছাকাছি চলে আসে, তখন আমি বেশ কিছুদিনের জন্য রংপুর চলে যাই। মোটামুটি রুটিনে চলত হত এখানে আসার পর থেকে। মেফতার বাড়ি রংপুর হওয়াতে, ওর সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতে যেতাম। তবে আমাদের পুর্বের মত মেসেঞ্জারে আড্ডা দেওয়া থেমে থাকেনি। তবে লক-ডাউন দীর্ঘ হওয়ার দরুণ, সবাই কিছু না কিছু কাজে নিজেকে জড়িয়েছে। যেমন কেউ টিউশন শুরু করেছে, কেউ বা ফ্রিলান্সিং শুরু করেছে। মানে কিছু একটা করছিল। তবে এর মাঝে সব থেকে মজা দিচ্ছিল অভিষেক। ওর তখন ভাদ্র মাস ও বসন্ত কাল দুটাই এক সাথে চলছিল। মানে ওর বিয়ের তীব্র আকাঙ্খা যেমন বেড়েছিল, ঠিক একই সাথে প্রচুর টিউশন করাচ্ছিল। যশোরের মত শহরে, মাসে ৬ ডিজিটের মত টাকা ইনকাম করেছে একটা সময় গিয়ে। ওর আফসোস, এত টাকা ইনকাম করেও কেন বিয়ে করতে পারছিল না। অভিষেক এখন কানাডায় থাকে, এখনো বিয়ে করতে পারেনি। এখন বলছে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে করবে।
আমার বড় বোনের বাসা রংপুর শহরের জুম্মাপাড়ায়। ওরা এখানো একান্নবর্তী পরিবারের মতই থাকে। আমি যখন ওখানে ছিলাম, তখন আপুর বড় ছেলে ক্লাস ৭-এ পড়ে। ওর আবার পশু-পাখির প্রতি তীব্র ভালোবাসা আছে। তাই বাসায় বিভিন্ন জাতের পাখি, মাছ আর কচ্ছপ ছিল। ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম আপুর ছেলে, এইসব পশু-পাখি নিয়ে ব্যস্ত আছে। এসবই দেখতাম। দিন ভালোই যাচ্ছিল এখানে। সকালে উঠতাম, আপুর শ্বাশুড়ি সকালের নাস্তা দিত, খেয়ে আপুর অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষা করতাম। দুপুরে আপু চলে এলে ওর সাথেই নানাবিধ কথা বলতাম দিনের বাকিটা সময়। মাঝে মাঝে বাসার জন্য কিছু আনতে হলে বাইরে যেতাম।
করোনার বন্ধ দেওয়ার আগে, আমি একটা পিসি কিনেছিলাম। সেটা কুয়েটেই ফেলে রেখে এসেছিলাম। রংপুর থাকাকালীন, একদিন ভাবলাম গিয়ে নিয়ে আসি। পরে দেখলাম, আমার মত অনেকেই খুলনা যেতে চায়। কুড়িগ্রাম থেকে আজমাইন, রংপুর থেকে আমি আর মেফতা রওনা দিলাম খুলনার উদ্দেশ্যে। মাঝে যাত্রা পথে পাবনায় সাজ্জাদের বাসায় একরাত ছিলাম। সাজ্জাদের বাসা পাবনার রূপপুরের একেবারে কাছেই। পাবনার দাশুরিয়া নেমে, সেখান থেকে ভ্যান বা ইজি বাইকে সহজেই চলে যাওয়া যায়। সাজ্জাদদের বাড়িটা গ্রামের ৮-১০ টা বাড়ির মতই, আধা-পাকা ঘর। ওদের বাড়ির চারিদিকে লিচু বাগান। এর ফলে বাড়ির ভেতর বাতাস একবারেই আসত না। এই এলাকাটায় এমনেই তীব্র গরম, তার উপর বাতাস চলাচল করতে না পরার জন্য গরম আরও তীব্র। সাজ্জাদের বাসায় গিয়ে দেখি অনেক কিছু রান্না করা হয়েছে আমাদের জন্য। নরমাল খাবারের পাশাপাশি পিঠাও বানানো হয়েছে। গোসল করে খেতে বসে যাই। এখানে পরে আমাদের সাথে এসে যুক্ত হয়, মাধব আর বসাক। ওরাও খুলনা যাবে। অনেক দিন পর এক সাথে হই সবাই। ভালই আড্ডা হয়। যদিও বেশির ভাগ কথাই অন-লাইনেই হয়ে গেছে, তাই নতুন কিছু জানার বা জানাবার প্রয়োজন ছিল না। মধ্য রাতে একবার বের হয়ে লিচু বাগানের ভিতর দিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরে, রুমে ফিরে ঘুম দিলাম। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন লিচুর সময় ছিল না, তাই লিচু খাওয়া হয়নি। তাই আমরা ২০২৪ সালে লিচুর মৌসুমে আবার যাই সাজ্জাদের বাসায়। তখন গিয়ে দুই দিন থেকে, প্রচুর লিচু খেয়ে এসেছিলাম।
পাবনা থেকে সরাসরি খুলনা না গিয়ে, আমরা কুষ্টিয়া যাই তাসরিমার সাথে দেখা করতে। ওর মা তখন সম্প্রতি মারা গেছে। তাই ওর সাথে দেখা করে ওখান থেকে খুলনা যাই। খুলনায় একদিন থেকে, যে যার মত জিনিস নিয়ে ফিরে যাই নিজের গন্তব্যে। এরপরও রংপুর আমি বেশ কিছুদিন ছিলাম। আমার বড় বোনের বাবু হওয়ার কিছুদিন পর, আমি জামালপুর ফিরে যাই। এই সময়ে কুয়েটের ২-১ এর সব ক্লাস অন-লাইনে শেষ হয়ে, ২-২ এর ক্লাসও শুরু হয়ে যায়। পরীক্ষা কিভাবে নিবে, এই সিদ্ধান্ত কুয়েট কতৃপক্ষ তখনো নিতে পারেনি।
রংপুর থেকে আবার ফিরে এলাম জামালপুর। এসে আমিও টিউশন শুরু করলাম। এক মাস টিউশন করিয়েই চলে গেলাম বান্দরবান। সব কিছুর মাঝেও ক্লাস চলছিল পুরোদমে। ২-২-র ক্লাস শুরু করার পর থেকে অন-লাইনে ল্যাবও নেওয়া শুরু করলো। মানে, স্যাররা এসে ল্যাবেও থিউরি দেখানো শুরু করলো। আর সফটওয়্যারের কাজ থাকলে, তা দেখাতো।
হুতুম ১০১
জামালপুর ফিরেও, আমার জীবন যাত্রার তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি। শুধু কিছু ছাত্র-ছাত্রী পড়াতাম। বাকি সব আগের মতই ছিল। সকালে উঠে ক্লাসে জয়েন করো, এই ফাঁকে সবার সাথে মেসেঞ্জারে আড্ডা মারো, বিকালে টিউশন, রাতে আবার গ্রুপ কল। এভাবে চলতে চলতে একদিন মাথায় এলো পুরো কুয়েটের একাডেমিক ম্যাটারিয়াল নিয়ে চ্যাটবট বানানো যায় নাকি। যেহেতু বুটেক্সে আছে এমন একটা আছে, তাহলে এটা পসিবল। এরপর কোন প্ল্যান ছাড়াই কাজে নেমে যাই আমি। তবে এটা করতে গিয়ে দুইটা জিনিসের প্রয়োজন ছিল, এক কুয়েটের ১৬ ডিপার্টমেন্ট সব নোট কালেক্ট করতে হবে। আর একটা লগো বানাতে হবে। এই কাজটার জন্য আমার দুই জন্য মানুষকে পছন্দ হয়। এক অভিষেক (আগেই বলেছি, ছেলেটা অনেক তৈলাক্ত), আর পিয়াস। পিয়াসের ইলাস্ট্রেশন স্কিল বেশ ভালো। ওদের বলার পর শুরুতে রাজিই ছিল। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর, দেখলাম ওদের আগ্রহ কম। তাই বাদ দিলাম ওদের। এরপর নিলাম মেফতাকে। বন্ধু মেফতাও যথেষ্ট তৈলাক্ত একটা ছেলে। ওই খুব দ্রুত বেশ কিছু ডিপার্টমেন্টের নোটস কালেক্ট করে ফেলে। তবে কিছু ডিপার্টমেন্টে মেফতার পরিচিত না থাকায়, সেগুলোর নোটস পাওয়া যাচ্ছিল না। এইসব নিয়ে একদিন রাফির (রোলঃ ০২) সাথে কথা হচ্ছিল। মেয়েটার কথাবার্তা বেশির ভাগ সময় হতাশাজনক হলেও, এই বিষয়ে ওর আগ্রহ দেখে বলে ফেললাম তুই কাজ করবি নাকি। দেখি রাজি হয়ে গেল সাথে সাথে। রাফি এতই ডেডিকেশনের সাথে কাজ করেছে যে, কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টের নোটস, ওই মোবাইলের ডাটা কিনে আপলোড করেছে। আর বাকি থাকে লগো বানানোর কাজ। BME BOSS এর লগো যেহেতু সুমাইয়াই বানিয়েছিল, তাই ওকে আবার বলার পর, ওই রাজি হয়।

এই লগো বানানোর কাহিনিটাও একটু অদ্ভুত। এই করোনার সময়, আমার হুট করে অনেক পেঁচা প্রীতি হয়। ইউটিউবে অনেক পেঁচার ভিডিও দেখতাম এই সময়। তেমন একটা চ্যানেল ছিল, Gen 3 Owl। এখানের গারু নামের পেঁচাটাকে আমার সেই পছন্দ হয়। যখন লগো বানানোর কথা হচ্ছিল, তখন রাফি, মেফতা অনেক আইডিয়া দিচ্ছিল। কিন্তু কোনটাই মন মত হচ্ছিল না। তাই আমি বলে বসি, একটা পেঁচা আঁকাও। পরের টা পরে দেখা যাবে। চ্যাট বটের নামটাও ঠিক একই ভাবে এসেছে। তবে আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন আমরা সবাই একে বলতাম, The BOT project। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, একটা পেঁচা কেন লগো। তখন আমি ডিফেন্ড করতাম, হ্যারি পটার মুভির পেঁচা গুলোকে দিয়ে। ওখানে যেমন পেঁচারা ডেলিভারি ম্যানের কাজ করত, হুতুমও কুয়েটের ডিজিটাল ডেলিভারি ম্যান। এটা একটা ভোগাস কথা ছিল, মুলত আমার পছন্দের কারণ একটা পেঁচা লগো হয়েছিল।
আমরা যখন কাজ শুরু করি তখন ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস চলে। কাজ শুরু পর আমাদের কাজ মোটা দাগে ভাগ হয়ে কয়েকটি ভাগে
আমি (চ্যাটবট সেটাপ)
রাফি (নোটস কালেক্ট এবং আপলোড)
মেফতা (গুগল ড্রাইভ ম্যানেজ, নোটস কালেক্ট এবং আপলোড)
সুমাইয়া (লগো ডিজাইন)
সুমাইয়ার কাজ কয়েকদিনের মাঝেই শেষ হয়ে যায়। বাকি থাকে আমাদের ৩ জনের কাজ। আমরা যখন সবার থেকে, নোটস নিচ্ছিলাম, তখন দেখলাম সব ব্যাচেরই নিজেদের একটা করে গুগল ড্রাইভ ছিল। কিন্তু আমরা সরাসরি এদের ড্রাইভ ব্যবহার করতে পারছিলাম না। কারণ যেকোন সময় ওদের ড্রাইভ ডিলেট করে দিতে পারে। তাই আমরা ১৬ টা ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা-আলাদা জিমেইল খুলি। এরপর সব গুলো ড্রাইভ-এ সেমিস্টার অনুযায়ী ফোল্ডার বানাই, এর ভিতরে কোর্স আর ল্যাব অনুযায়ী ফোল্ডার বানাই। যেন সব সময় অর্গানাইজড থাকে। চাইলে কোন ম্যাটারিয়াল খুঁজে পাওয়া যায়। একই কাজ করি আমরা প্রতি সেমিস্টার ফাইনালের প্রশ্নের ক্ষেত্রেও। এই গুগল একাউন্ট খোলার কাজ গুলো করে মুলত মেফতা ও রাফি। এরপর এই নতুন খোলা ড্রাইভে আমরা সব নোট আপলোড শুরু করি। এরপর একটা সমস্যা হয়। শুরুতে আমাদের ড্রাইভের সব কিছু পাবলিকলি উন্মুক্ত ছিল। চ্যাটবট উন্মুক্ত করার পর, সবার একটা কথাই ছিল, কুয়েটের সব একাডেমিক নোট কেন পাবলিকলি থাকবে। আমরা এই সমস্যারও সমাধান করি। এটা করি আমরা কুয়েট মেইল ব্যবহার করে। তবে এর জন্য কুয়েট প্রশাসন একটু ধন্যবাদ পাবে। করোনার কারণে, কুয়েট থেকে প্রতি ডিপার্টমেন্টে ক্লাস অনুযায়ী মেইল গ্রুপ খুলে দেয়। যেমনঃ bme18@stud.kuet.ac.bd, এই মেইল এড্রেসে মেইল করলে বিএমই ‘১৮ এর সবার কাছে মেইল চলে যাবে। এটা করে যেন, কুয়েটের টিচাররা সহজে পুরা ক্লাসের সবাইকে মেইল দিতে বা কোন রিসোর্স শেয়ার করতে পারে। তবে যে এই কাজটা করে, তার টেকনিক্যাল জ্ঞান একটু কম ছিল। সে প্রতিটা মেইল গ্রুপের “visibility” অর্গানাইজেশন লেভেলে পাবলিক করে রেখেছিল। মানে কুয়েট মেইল ব্যবহার করে যে কেউ অন্য ডিপার্টমেন্টের মেইল গ্রুপের মেইল পড়তে পারত। এবং কে কে আছে গ্রুপে তাও দেখতে পারত। আমরা এই সুযোগটাই নিয়েছি। এখান থেকে সবার মেইল নিয়ে নিয়েছি। ফলে পুরো কুয়েটের সবার মেইল এড্রেস আমাদের কাছে ছিল। এটার ব্যবহার একটু পরে করেছি আমরা। আর আমরা নিজেদের কুয়েট মেইল ব্যবহার করে একটা মেইল গ্রুপ খুলেছি, তার নাম hutum@stud.kuet.ac.bd। এই মেইল গ্রুপে আমরা কুয়েটের তখনকার সব মেইল গ্রুপকে যুক্ত করেছি। এই কাজটা আমরা করেছি এমন ভাবে যেন, কারও কাছে কোন নোটিফিকেশন মেইল না যায়। আর আমাদের খোলা ড্রাইভ গুলোকে প্রথমে একটা মুল গুগল একাউন্টের সাথে শেয়ার করেছি। পরে ওই মুল একাউন্টের ফোল্ডারে কুয়েটের মেইল গ্রুপের (hutum@stud.kuet.ac.bd) সাথে শেয়ার করেছি। এতে করে কুয়েটের সবার মেইলে আমাদের ড্রাইভের “View Access” চলে যায় অটোমেটিক। আমাদের কোন ম্যানুয়াল ইনপুট দিতে হয়নি। যে কেউ চাইলেই আমাদের ড্রাইভ দেখতে পারত তাদের ড্রাইভের “shared with me” অপশন থেকে। আমার বিশ্বাস কেউই জিনিসটা বুঝতে পারে নাই। এতে করে আমাদের ড্রাইভ আর পাবলিক এক্সেস থাকে না। আর পরবর্তিতে যদি কুয়েট প্রশাসন থেকে যদি মেইল গ্রুপ না খুলে দেয়, তাই আমরা একটা সার্ভার বানাই সেখানে যেকেউ তার কুয়েট মেইল one time OTP ব্যবহার করে ভেরিফাই করে আমাদের ড্রাইভে তাদের মেইল যুক্ত করার রিকোয়েস্ট করতে পারত। আমরা পরে আমাদের মেইল গ্রুপে ঐ মেইলকে ম্যানুয়ালি যুক্ত করে দিতাম, আমাদের মেইল গ্রুপে। এটাই ছিল শেষ পর্যন্ত আমাদের চ্যাটবটে একমাত্র যায়গা যেটায় সরাসরি মানুষের হাত ছাড়া কাজ করত না। এ ছাড়া বাকি সবই সেলফ সার্ভিস হয়ে গিয়েছিল।
আমি এই চ্যাটবটে NLP এর জন্য কোন কোড করি নাই। পুরাটাই তখনকার প্রচলিত SaaS ব্যবহার করে করেছি। গুগলের একটা সার্ভিস আছে, নাম Google Dialogflow। এটা ব্যবহার করে সহজেই চ্যাটবট বানানো যায়। মোটামুটি ভালই ট্রেইন করা যায় যেকোন ভাষায়। শুধু কিছু টেস্ট কেস দিতে। মানে সম্ভাব্য কিছু প্রশ্ন দিয়ে দিলে, এর কাছাকাছি প্রশ্ন হলে Dialogflow ধরতে পারত সহজেই। এবং একই প্রশ্নের একাধিক উত্তর রেখে দেওয়া যেত। Dialogflow একাধিক উত্তরে মধ্য থেকে র্যান্ডমলি উত্তর দিত যেকোন একটা। মানুষ দেখে ভাবত অনেক ন্যাচারাল। আসলে এখানে আমার নিজের কোন কিছুই ছিল না। আমি শুধু বুদ্ধিমানের মত গুগলের ওই সার্ভিসটাকে ব্যবহার করেছিলাম। গুগলের সার্ভিস হওয়াতে এটায় মডিফিকেশনের সুযোগ ছিল অনেক কম। কিন্তু চ্যাটবটটি লঞ্চ করার আগে, আমি ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখে বুঝতে পারি যে এই Dialogflow এর সাথে একটা সার্ভার যুক্ত করা সম্ভব। এরপরই হুতুম তার বর্তমান রূপে যাওয়ার প্রসেস শুরু হয়। আমি ইউটিউব ভিডিও দেখে দেখে, কিছু সার্ভিস যুক্ত করি। যেমনঃ আবহাওয়া পূর্বাভাস, নামাজের সময়, কুয়েট বাসের শিডিউল ইত্যাদি। এগুলা খুবই বেসিক জিনিস। এরপর আমরা হুতুমকে সবার সামনে প্রকাশ করার জন্য মোটামুটি তৈরি হতে থাকি।
ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে কাজ শুরু করে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে কাজ মোটামুটি শেষ হয়। শুরুতে চ্যাটবটটি ফেসবুকের সাথে কানেক্ট করি (পরে ফেসবুকের পলিসি চেঞ্জের কারণে, সেটাকে আর রাখতে পারিনি ফেসবুকে। বাধ্য হয়ে টেলিগ্রামে শিফট করতে হয়)। মে মাসের ৯ তারিখ থেকে আমরা কুয়েটের সবাইকে মেইল পাঠাতে শুরু করি, আমাদের চ্যাটবট ব্যবহার করার জন্য। আগেই বলেছিলাম না সবার মেইল নিয়ে নিয়েছি। সেটা দিয়েই মেইল করেছিলাম। তবে আমরা একবারই এই কাজটা করেছিলাম। কোনদিন ব্যবসা করিনি ঐ মেইল দিয়ে। যাই হোক, হুতুম ইন্সট্যান্ট হিট হয়ে যায়। এবং গালিও খাওয়া শুরু করি। গালি খাওয়ার কারণ হলো, তখন কুয়েটে কিছু ডিপার্টমেন্টের নিজেস্ব চ্যাটবট ছিল। ওদের ডাটা গুলো পাবলিক থাকায়, ওদের নোট গুলোও আমরা আমাদের চ্যাটবটে যুক্ত করে দেই। এতে কিছু কিছু যায়গা সমালোচনা হচ্ছিলো। পরে যারা যারা অভিযোগ দিচ্ছিল, ওদের নোট গুলো ডিলিট করে ফেলি আমাদের ড্রাইভ থেকে। এরপর থেকে, তেমন আর সমালোচনা হয়নি হুতুম নিয়ে। তবে আমার কোন বন্ধু ফেইক আইডি খুলে হুমকি দিয়েছিল। যেন অফ করে দেই। আমি তেমন কিছুই করি নাই এটা নিয়ে, শুধু ওই মেসেজটা ইগনোরে ফেলে দিয়েছিলাম। এখনো আছে মেসেজটা।
কুয়েটে যে ইমেইল এড্রেসটা দেওয়া হয়, সেটা গুগলের থেকে কেনা। গুগলের এডুকেশনাল মেইল। শুরু থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গুগল এই মেইল গুলোতে কোন স্টোরেজ লিমিট সেট করে দেয়নি। মানে সবাই আনলিমিটেড স্টোরেজ পেতো যাদের কুয়েট মেইল ছিল। এই সুযোগটা নিয়েছিল আমার বন্ধু মেফতা। সে তার পছন্দের মুভি গুলো কুয়েট মেইলে রেখে দিত। একদিন সে বলে, আমার এই ড্রাইভটার লিংক হুতুমে দিয়ে রাখ। কেউ চাইলে দেখতে পারে। পরে ধীরে ধীরে এটা ভালই বড় হয়, আমি তখন এমন একটা সিস্টেম করি যেন, চ্যাটবট থেকে আমাদের ড্রাইভে কোন কোন মুভি আছে তা সরাসরি সার্চ করে দেখতে পারে। কিন্তু সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না। কুয়েট অথোরিটিকে যখন গুগল মেইল দিল যে, তারা স্টোরেজ ১০০ টেরাবাইটের বেশি দিবে না, তখন কুয়েট অথোরিটি দেখে আমার বন্ধু মেফতা একাই ২ টেরাবাইট নিয়ে বসে আছে। পরে ওর ইমেইল ব্লক করে দেয় কুয়েট। পরে মেফতা আবার আবেদন করে আইডি নিয়ে এসে, সব মুভি ডিলেট করে। তখন আমরা ফ্রি স্টোরেজের জন্য চলে যাই, টেলিগ্রাম চ্যানেলে। সেখানে একটাই সমস্যা ছিল ২ জিবির বড় ফাইল আপলোড করা যেত না। তাতেও খুব একটা সমস্যা হয়নি আমাদের। বেশির ভাগ মুভিই ছিল ২ জিবির থেকে ছোট। তারপর যে সমস্যাটা হয়, সেটা হলো কপিরাইট। অনেকেই ইচ্ছা করে আমাদের চ্যানেল গুলোতে কপিরাইটের জন্য রিপোর্ট করত। এতে করে আমাদের সব ডাটা একবারে হাওয়া হয়ে যেত। লাস্টে আমরা এমন একটা সিস্টেম দাড়া করাই যে, ঐটাকে কপারাইট দিয়ে ডাউন করা সম্ভবই না। আর যদি কোন ভাবে করেও ফেলে, আমরা পুরা সিস্টেমটার ফুল ব্যাকাপ রেখে দেই। শুধুমাত্র একটা ক্লিকে আবার সব মুভি ফাইল রিস্টোর করা যেত। এরপর আমরা ওয়েবসাইটও লঞ্চ করি, মুভির জন্য। এটার ফুল টেকনিক্যাল ব্লগ লিখেছিলাম LinkedIn -এ। চাইলে পড়তে পারেন।
এছাড়াও আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং বই এর জন্য আলাদা একটা টেলিগ্রাম চ্যানেল চালু করি। এখানে প্রায় ২০০+ বই আপলোড করেছিলাম আমরা। আর কুয়েটের সুন্দর ছবির কোন ডাটাবেজ না থাকায়, আমরা আমাদের ওয়েবসাইটে সেটাও যুক্ত করি। একটা সময়ে গিয়ে মনে হয়েছে, এই চ্যাটবটটি মানুষ শুধু মুভির জন্যই ব্যবহার করছে। প্রায় ২ হাজার মেম্বার ছিল মুভি গ্রুপে। আর বই চ্যানেলে সাবস্ক্রাইবার ছিল ১.৫ হাজারের মত।
হুতুম যখন লঞ্চ করি আমরা, তখন আমার প্রোগ্রামিং জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। শুধুমাত্র সি/সি++ পারতাম একটু। আমি যে সার্ভারের কোড কোন ল্যাংগুয়েজে করছি তাও বুঝতে পারি নাই প্রথম ২ মাস। আসলে জানতে চাইনি। কোড কাজ করতেছে, তার মানে ঠিক আছে সব। আর আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন ChatGPT এর মত কোন LLM বাজারে আসেনি। তাই যদি কখনো আটকে যেতাম তখন StackOverFlow-ই একমাত্র ভরসা ছিল। ঘন্টার পর ঘন্টা লাগত একটা সমস্যার সমাধান বের করতে। তবে কাজটা করে বেশ মজা পেতাম। কিছু দিন আগে, হুতুমের সব সার্ভিস আমরা বন্ধ করে দেই। কারণ এটাকে চালানোর মত তেমন কোন লোক পাচ্ছিলাম না। আমরাও সবাই এখন প্রফেশনাল লাইফে ব্যস্ত। তাই দীর্ঘ ৫ বছরের পথ চলার সমাপ্তি হয় ২০২৬ সালে এসে। তবে যখন বন্ধ করার পোস্ট দিলাম, তখন কমেন্টে মানুষের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছি। তবে আমার মনে হয়েছে এটা বন্ধ করে দেওয়ার সময় হয়েছিল। কারণ আমি যে টেকনোলজি গুলো ব্যবহার করেছিলাম, তা পুরাতন হয়ে গিয়েছিল। এখন নতুন ভাবে করার সময় এসেছে। হয়ত কিছুদিনের মাঝেই কেউ এর থেকে ভালো কিছু লঞ্চ করবে।
হুতুমেরঃ
অন-লাইন এক্সাম
২০২১ এর জুন মাস হতে হতে, কুয়েট প্রশাসন ঠিক করে তারা অন-লাইনেই সেমিস্টার ফাইনাল গুলো নিবে। শুরুতে হালকা সমালোচনা হলেও, কুয়েট প্রশাসন তার অবস্থান বজায় রাখার কারণে পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। তবে এই পরীক্ষা গুলো নেওয়া হয় একটু অন্যভাবে। সাধারণত কুয়েটের প্রতিটি সেমিস্টার ফাইন পরীক্ষা হয় ২১০ নাম্বারের উপর। ৬ টা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় ৩ ঘন্টা সময়ের মাঝে। প্রতিটি পরীক্ষার মাঝে গ্যাপ সাধারণত থাকত ৪-৫ দিন করে। কিন্তু অন-লাইনের এক্সাম গুলোর জন্য নিয়ম হালকা পরিবর্তন করা হয়। পরীক্ষা হবে ১২০ নাম্বারে। সময় ৩ ঘন্টার যায়গায় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট। আর ৪ টি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হবে প্রতিটি প্রশ্নের মান ৩০ করে। পরীক্ষার মাঝে গ্যাপ ৭ দিন করে। আর কেউ নিজে লিখছে নাকি অন্য ভাবে লিখছে তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরের দিন একটা ৫ মিনিটের একটা ভাইবা নিত। আর কেউ যেন এক্সামের আগে দেখে না লিখতে পারে তার জন্য প্রতি পাতায় একটা কোড লিখতে হত, এই কোডটা জানানো হত এক্সাম শুরুর আগে। কোড কোথায় লিখবে তাও ঠিক করে দিত। সত্যি কথা বলতে, চুরির বেশির ভাগ পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু বাঙালিকে আটকানো কঠিন। আরেকটা কথা বলা হয়নি। আমাদের ২-১ এর পরীক্ষার আগে ২-২ এর পরীক্ষা হয়। কারণ ২-১ এর পর যেহেতু ২-২ এর ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছিল, তাই অনেক দিনের একটা গ্যাপ পরে গিয়েছিল। তাই আগে ২-২ পরীক্ষা হয়ে, এরপর এক মাস আবার ২-১ এর ক্লাস রিভিশন করিয়ে পরীক্ষা নিবে।
এখন আমাদের গ্রুপের যারা ছিলাম, এদের মাঝে অনেকের আর বাড়িতে ভালো লাগছিল না। তাদের মাঝে ৬ জন বললাম খুলনা গিয়ে এক্সাম দিব। বাড়িতে পড়াশোনা হচ্ছে না। এই ৬ জনের মাঝে মাত্র একজনের বাড়িতে শুধু নেটের প্রবলেম ছিল। আর বাকি সবাই বাড়ি থেকে মুক্তির জন্য খুলনা চলে এলাম। উঠলাম সবাই আমার বাসায়। তখনো আমরা আলাদা ছিলাম। তাই যেকোন একটা বাসায় উঠা দরকার ছিল। আর আমার বাসাটা তখন সব থেকে ভালো ছিল। আমি বাড়িওয়ালার সাথে কথা বলে উঠে গেলাম। আমার সাথে যারা উঠলোঃ রিফাত, আজমাইন, সাজ্জাদ, সিফাত আর মেফতা। আর সিএসই-র একজন এলো। ওরও বাসায় ভালো লাগছিল না।
পরীক্ষার ৭ দিন আগে আমরা এক এক করে চলে এলাম। সবার শেষে এলো মেফতা। রংপুর থেকে সকাল বেলা এসেই, সে বিকাল বেলা চিটাগাং চলে গেল বাবুর সাথে দেখা করতে। এই লক ডাউনে দেখা হয়নি অনেক দিন। তাই বাবুর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে গেল। তবে যে উদ্দেশ্যে যাওয়া, সেই উদ্দেশ্য আমার পুরণ হয়নি। সবাই মোটামুটি পড়াশোনা করলেও, আমার হচ্ছিল না। করোনার সময়ের এই পড়াশোনার গ্যাপটা আমি আর কোনদিন কাটিয়ে উঠতে পারিনি কুয়েটে থাকতে। তবে পড়াশোনা বাদে, বাকি সব কিছুতে আমার অংশগ্রহণ ছিল প্রবল ভাবে। আমরা তখন খাওয়া-দাওয়া করতাম “করিম মামার” দোকানে। সবাই এক সাথে দল বেঁধে চলে যাইতাম। সেখানে দুপুরে খেয়ে রুমে ফিরে আসলেও রাতে ফিরে আসতাম না। রাতে চলে যেতাম কুয়েটের ভেতর। তখন কুয়েট পুরো ফাঁকা। হল বন্ধ, ক্যাম্পাসে অফিসিয়াল কাজ ছাড়া কিছুই হয়। আমরা গিয়ে শহীদ মিনারে আড্ডা দিতাম। শহীদ মিনারের ওয়াল গুলোতে উল্টা হয়ে শুয়ে থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুনিয়ার সব আলোচনা চলত আমাদের। এরপর রাত ১১-১২ টার দিকে রুমে ফিরে যেতাম। সেখানে গিয়ে ঘুম। যখন পরীক্ষার আগের দিন এসে যেত, ওইদিন রিফাতের কাছে গিয়ে কি কি পড়তে হবে তা শুনে আসতাম। যদিও খুব একটা লাভ হত না, তাও আর কি চেষ্টা করতাম একটু। পরে প্রথম একটা-দুইটা পরীক্ষায় ধরা খেয়ে ভাবলাম দুই নাম্বারি করব। পরে দেখলাম আমারে দিয়ে দুই নাম্বারিও সম্ভব না। দুই নাম্বারি করতে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হবে, ঐটা দিতেও আমার সমস্যা হচ্ছে। তবে একটা পরীক্ষার আগেই খাতায় সব সম্ভাব্য কিছু উত্তর সুন্দর করে লিখে রাখছিলাম। পরীক্ষার সময় দেখি কিছুই আসে নাই। পরে আর কি ওই পথও বাদ। তবে প্রতি পরীক্ষার পর আমাদের রুটিন ছিল চুই-ঝাল খেতে যাওয়ার। পরীক্ষা যেমনই হোক না কেন, এটা মিস হতো না। এইভাবেই আমার ২-২ এবং ২-১ পার হয়। তবে দৈব কোন কারণে আমি একটাতেও ফেল করিনি।
২-২ এর পরীক্ষার পর বাসায় এলো রাশেদ। তখন ওরা RS মঞ্জিল ছাড়ার চিন্তা করছিল। রাশেদ যদিও ছাড়তে চাচ্ছিল না। কিন্তু রিফাতের চাপে পড়ে রাজি হয়ে যায়। মেফতারাও ওদের বাসা পরিবর্তন করবে। পরে খুঁজতে খুঁজতে ওরা সবাই মিলে “আফসার ম্যানশন”-এ দুইটা ফ্যাট নেয়। একটা ফ্ল্যাটে ৬ জন, আরেক ফ্ল্যাটে ৩ জন উঠে। আর অভিষেক হলে সিট পাবে দেখে আর আমাদের সাথে উঠে না। আমি আর পিয়াস তখনো নিজের বাসায় আলাদা আলাদা আছি। এর মাঝে কুয়েট খুলে দেওয়ার কথা শুরু হয়ে গেল। এর কিছুদিন পর অবশেষে কুয়েট খোলার নোটিশ দিল। দীর্ঘ প্রায় ১.৫ বছর পর, কুয়েট আবার খুললো।
করোনার পর কুয়েট
কুয়েট খোলার নোটিশ দেওয়ার পর, আস্তে আস্তে সবাই আসা শুরু করল। “আফসার ম্যানশন”-এ গিয়ে উঠলোঃ রিফাত, আজমাইন, রাশেদ, সাজ্জাদ, আরিয়ান, সিফাত, ফাহিম, মেফতা আর স্মরণ। আমরা আলাদাই রয়ে গেলাম। কুয়েট খোলার পর, প্রথম এক সপ্তাহ দিল ২-২ এর ল্যাব গুলো শেষ করানোর জন্য। সে আরেক প্যারার কাজ। ৩ টা ল্যাব ছিল ২-২ তে। যে ল্যাব গুলো ১৩ সপ্তাহে শেষ করার কথা তা ৫ দিনে (সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ) শেষ করতে হবে। এবং সব ল্যাব রিপোর্টও জমা দিতে হবে। দিনে কমপক্ষে দুইটা করে ল্যাব করতে হত, সেখানে যেত ৫ ঘন্টা সময়। আবার বাসায় গিয়ে ল্যাব রিপোর্ট লিখো। এই একাডেমিক চাপের সময়, আমি আর পিয়াস, রিফাতদের ফ্ল্যাটে গিয়েই ল্যাব রিপোর্ট লিখা থেকে শুরু করে রাতে থাকা শুরুও করলাম। এমন অবস্থা যে নিজের বাসায়ই যাই না আমরা। যেহেতু এখানেই থাকা হচ্ছে, তাই আমি আর পিয়াস চিন্তা করলাম বাসা ছেড়ে দিয়ে চলে আসি। পরে নিজের বাসার শেষ মাসের ভাড়া দিয়ে উঠে এলাম রিফাতদের ফ্ল্যাটে। যেহেতু ওখানে রুম দুইটা ছিল, তাই আমি আর পিয়াস কমন স্পেসেই থাকা শুরু করলাম। আর আমার পিসিটা বসালাম রান্না ঘরে। অবশেষে বৃত্ত পুরণ হলো, আমরা সবাই একসাথে থাকা শুরু করলাম ২০২১ এর নভেম্বর মাস থেকে।
করোনা যে মানুষের মনে কতটা আঘাত ফেলেছে তা কুয়েট খোলার পর বুঝা গেল ভালো করে। একে মানসিক অবস্থা অনেকের খারাপ, তার উপরে হুট করে অনেক বেশি একাডেমিক প্রেসার, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দুইজন ছাত্র সুইসাইড করে ফেলল। কুয়েটে তখন টালমাটাল অবস্থা। কুয়েট প্রশাসন আবার বন্ধ দিয়ে দিল ভার্সিটি। অনেকেই বাড়ি গেলেও আমরা থেকে যাই, কারণ বন্ধ দিয়েছেই মাত্র ৭ দিনের জন্য। পরে খুলে ২-২ এর সব শেষ করে, আবার ক্লাস শুরু হলো ২-১ এর। এর মাঝে হলের একটা ঝামেলাকে কেন্দ্র করে পলিটিক্যাল ছাত্রদের সাথে হল প্রভোস্টের ঝামেলা হলো। ঝামেলাটা মনে হয় স্যার নিতে পারে নাই। বিকালেই স্ট্রোক করে মারা যায় স্যার। আবার গরম হয়ে গেল ভার্সিটি। এবার আবারও বন্ধ করে দিল কুয়েট। এবারও আমরা গেলাম না। কারণ এই বন্ধটা দিচ্ছিল ৭ দিন করে। মানে বন্ধের ৭ দিন শেষ হয়ে গেলে, প্রশাসন আবার ৭ দিন করে বর্ধিত করতেছিল। তাই বাড়ি যাব কি যাবনা তাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
আফসার ম্যানশনে উঠার পর, পিয়াস একদিন বিকালে গিয়ে একটা ইনডাকশন চুলা কিনে আনে। সাথে কিছু হাড়ি-পাতিল। ও নিজে রান্না করে খাবে। পরে আমরাও টাকা দিয়ে এসবে শরীক হয়ে গেলাম। এভাবেই বাসায় আমাদের নিজেদের রান্না করে খাওয়া শুরু হয়। আর স্যার মারা যাওয়ার পর কুয়েট যখন আবার বন্ধ হয়ে গেল, তখন আমরা বাসায়ই রান্না করে খাওয়া শুরু করলাম। সেটা ডিসেম্বর মাস। শীত পড়তে শুরু করছে। ঘুম থেকে উঠি ১১-১২ টায়। উঠে দেখি পিয়াস রান্না শুরু করছে। আমরা টুকটাক কাটাকাটি করে দিতাম। এরপর দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে আবার ঘুম। রাতে আবার উঠে খেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে আবার ঘুম। আর তখন আমাদের বাসায় যেহেতু ফ্রিজ ছিল না, তাই দুইদিন পর পর বাজার করতে হত। এটাই ছিল আমাদের রুটিন। এই ঝামেলার সময় কুয়েট প্রায় ১ মাসের মত বন্ধ থাকে। আমরাও এইভাবেই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছি একটা মাস। গরম আর একাডেমিক প্রেশার না থাকলে কুয়েটে থাকার মত আরামের কিছু হতেই পারে না। আর এই সময়টাতে দুইটার একটাও ছিল না।
জানুয়ারি মাসের দিকে করোনার প্রকোপ খানিকটা আবার বেড়ে যায়। সাথে স্যার মারা যাওয়ার কারণে প্রশাসন ভার্সিটি খুলতেও একটু ইতস্তত করছিল। এই দুই কারণে প্রশাসন আবার সিদ্ধান্ত নিল, ২-১ এর পরীক্ষাও অন-লাইনে হবে। তাই নেওয়া হলো। ২-২ এর মত একই ভাবে। পরীক্ষা শেষের পর কুয়েট খুলে আবার ২-১ এর বাকি ল্যাব গুলো নেওয়া হলো। যেহেতু ২-১ এর শুরু করোনার আগেই হয়েছিল, তাই দেখা গেল কিছু কিছু ল্যাব রিপোর্ট লিখা হয়েছে ১ বছর আগে, কিন্তু জমা দিচ্ছি ১ বছর পর। এটা দেখে মনে হলো, জীবন থেকে একটা বছর নাই হয়ে গেছে। এই বছরটার কোন হিসাব নাই। যথারীতি ২-১ এর ল্যাব শেষ হলো। অবশেষে দীর্ঘ ২ বছর পর এসে আমরা ২য় বর্ষ শেষ করতে পারলাম। এরপর আর কুয়েট বন্ধ দেয়নি করোনার জন্য। সব কিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে।
২য় বর্ষ শেষ হতে হতে আমাদের গ্রুপটা এক সাথে হয়ে যায়। এতে আমাদের অবদান কমই আছে। আমরা কখনোই এক সাথে উঠার জন্য খুব একটা চেষ্টা করিনি। সময়ের সাথে সাথে যেন সবাই একটা ছাঁচে বসে গেছি। এর মাঝে আবার কিছু কিছু মানুষের সাথে সম্পর্কটা একটু পরিবর্তন হয়ে যায়। এত সময় পর এসে ওই জিনিস গুলো নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছা করেনা। এখন মনে হয় যা হয়েছে, খুব একটা খারাপ হয়নি।
— নিলয়
