← All Posts
bme_18kuet_bmebandarbantour

মেঘ আর পাহাড়ের মাঝে (বান্দরবান)

সবাই বলে সমুদ্র মানুষকে টানে, কিন্তু আমাকে টানে পাহাড়। বান্দরবানের পাহাড়ে ঘুরেছি বেশ কয়েকদিন। তার স্মৃতি রোমন্থন করব আজ।

Jaied Bin Mahmud31 min read
মেঘ আর পাহাড়ের মাঝে (বান্দরবান)

যদি ভ্রমণপিপাসু কাউকে জিজ্ঞাসা করা হয় কোন যায়গায় ঘুরতে ভালো লাগে তাহলে সাধারণত দুইটি জবাব পাওয়া যায়। এক সমুদ্র, দুই পাহাড়। আমি দ্বিতীয় শ্রেণীর দলে। এবং আমার সব বন্ধু-বান্ধবও তাই। এর ফলে জীবনে ভালই পাহাড় দেখা হয়েছে।

পাহাড়ের বেশ কয়েকটি জিনিস আমার ভালো লাগে, এর মাঝে একটি এখানে লোক সমাগম থাকে অনেক কম যার ফলে বেশির ভাগ সময় একটা নিঃস্তব্ধতা গ্রাস করে থাকে, দুই এখানে মেঘের খেলা দেখা যায়। বাড়ি জামালপুর হওয়ায়, পাশের জেলা শেরপুরে টুকটাক টিলা দেখার সুযোগ ছোটবেলাতেই হয়েছিল। কিন্তু প্রথম পাহাড় দেখার সুযোগ পেতে ভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষে উঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

গল্প শুরুর আগে একটা কথা বলে নেওয়া দরকার, উপরের ছবিটি সাজেকের। বান্দরবনের ছবি গুলো খুঁজে পাচ্ছি না। গুগল ড্রাইভটা নাই হয়ে গেছে। তাই যারা ব্লগটি পড়ছেন তাদের ছোট্ট একটা সাজেশন দিয়ে রাখি, যদি কখনো ছবি রাখার দরকার হয় টেলিগ্রাম গ্রুপে রাখতে পারেন। জিনিসটা অনেক সেফ লাগছে আমার কাছে, পাশাপাশি স্টোরেজ নিয়েও ঝামেলা কম।

আপডেটঃ পরে অনেক ছবি পাওয়া গিয়েছিল। বন্ধু মেফতার ল্যাপটপে সব ছিল।

সতর্কতাঃ ব্লগটি বেশ বড়।

প্ল্যানিং

আমরা যখন দ্বিতীয় বর্ষে উঠি তখন ২০২০ সাল। কিছু দিন ক্লাস শুরুর পরই করোনার জন্য দেশব্যাপি লক-ডাউন শুরু হয়। এর ফলে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত আমাদের ভার্সিটিও বন্ধ হয়ে যায়। যদিও কিছুদিন পর অন-লাইনে ক্লাস শুরু হয়েছিল, ওইটাকে আসলে আমার ক্লাস বলে মনে হয় নাই কখনো।

দীর্ঘ দিন বাসায় বন্দী থাকার কারণে, আমরা বন্ধু-বান্ধব সবাই চাচ্ছিলাম কোথাও একটু ঘুরে আসা যায় নাকি। এরই মাঝে স্কুলের কিছু বন্ধুদের ছবি দেখলাম বান্দরবানে ঘুরতে গিয়েছিল। ওদের কিছু ছবি ভার্সিটির গ্রুপে দেওয়ার পর, হালকা কিছুক্ষণের মাঝেই দেখলাম গ্রুপের মোটামুটি সবাই রাজি। দীর্ঘদিন বাড়ি থাকার অনেক গুলো কুফলের মাঝে একটা সুফলও ছিল, সবাই এই সময়টাতে অনেক টিউশনি করিয়ে ভালো টাকা ইনকাম করে ফেলেছিল। তাই ট্যুর নামাতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি।

প্রথমে প্ল্যান ছিল ৩ দিনের ঢাকা-বান্দরবান-ঢাকা ট্যুর হবে। ঘুরব বান্দরবান শহর ও শহরের আশে-পাশে এর পর থানচি গিয়ে আমিয়াখুম আর নাফাখুম দেখে চলে আসব। পরে অবশ্য এই প্ল্যান টিকে নি। বাঙালি মধ্যবিত্তকে যদি একটা জিনিস ৫০ টাকায় আর সেই একই জিনিস দুইটা ৮০ টাকায় দেওয়া হয়, বাঙালি দুইটা ৮০ টাকা দিয়ে কিনবে। আমাদের ট্যুরের দিন সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ অনেকটা এমনই। আমরা ব্যাক করার সময় দেখলাম যদি আরও ৩০০০ টাকা বেশি খরচ করা যায় তাহলে রোমা, বগা লেক, কেওক্রাডং দেখে আসা যায়। পরের বার গেলে আবার ঢাকা টু বান্দরবানের বাস ভাড়া লাগবে। এই কঠিন হিসাব করে অতিরিক্ত আরও ৪ দিন বান্দরবান ঘুরে বাড়ি ফিরেছি।

দলের বিবরণ

যদিও এর আগে আমরা ভার্সিটি থেকে ট্যুরে গিয়েছিলাম, তারপরও এটা ছিল আমাদের প্রথম গ্রুপ ট্যুর। পাশাপাশি দীর্ঘদিন দেখা না হওয়ার দরুণ সবাই চাচ্ছিল এক সাথে হতে। আমি ছাড়াও এতে যুক্ত হয় আজমাইন, ফাহিম, বসাক, সাজ্জাদ, মেফতা, আরিয়ান, রাশেদ ও রিফাত। নয় জনের এক বড় ট্যুর গ্রুপ।

যাত্রা

এই ট্যুরটি হয় ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সালে। তাই দীর্ঘ ৫ বছর পর এসে সঠিক তারিখ গুলো আর মনে নেই। তবে সেটা ফেব্রুয়ারির ৭ তারিখ হবার সম্ভাবনা বেশি। আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী সবাই যে যার বাড়ি থেকে ঢাকা যাবে। সেখান থেকে আমরা রাতে বাসে করে বান্দরবান পৌছাবো। আমরা রাত ১০ টার সেন্টমার্টিন পরিবহনের বাসে করে আল্লাহর নামে যাত্রা আরম্ভ করি। মাঝে বাস যাত্রা বিরতি দিলেও গভীর ঘুমের কারণে নামা হয়নি। একবারে সকালে ঘুম ভাঙে বান্দরবান পৌঁছে।

বান্দরবান শহর

পরের দিন সকালে পৌঁছাই বান্দরবান শহরে। আসলে বান্দরবানকে শহর বলা ঠিক হবে না, এটা মফস্বলের মত। আমি যদিও জামালপুরের মত ছোট শহরে বড় হয়েছি, আমার কাছে বান্দরবান তার থেকেও ছোট লেগেছে। বাস থেকে নামার পর নিজেদের বড় একটা ভুল ধরা পড়ল। এখন পর্যন্ত ট্যুরের সকল প্ল্যান আমাদের ছিল থানচি থেকে। মানে থানচি নেমে গাইড নিব, গাইড ঠিক করা আছে, কোথায় কি কি খাওয়া হবে তাও প্ল্যান করা আছে। কিন্তু বান্দরবান শহরে কই থাকব এই প্ল্যান আমাদের ছিল না। তখন না বুঝলেও এখন লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে অনেক উচ্চ বোকাচন্দ্র ছিলাম গ্রুপের সবাই। পরে সবাই হাটা ধরলাম, খুঁজতে লাগলাম হোটেল। স্কুলের এক ফ্রেন্ডকে কল দিলাম ওরা কই ছিল শুনতে। এখন অনেকে ভাবতে পারেন, আশে-পাশের কোন একটা হোটেলে গিয়ে উঠে পড়লেই ত হতো। না, তা সম্ভব ছিল না। কারণ বাজেট টাইট ছিল সবার। পরে রাশেদ আর রিফাত এক বছর আগে অন্য একটা গ্রুপের সাথে বান্দরবান এসে যে হোটেলে উঠেছিল খুঁজে খুঁজে সেখানে গেলাম। এবং অতি সস্তা এক হোটেলে উঠলাম। রুমে উঠার পর হোটেল মালিক এসে ইশারা-ইঙ্গিতে বলে গেল,

যদি কিছু লাগে জানাবেন।

আমাদের কিছু লাগে নাই তাই জানানোর দরকার হয় নাই। তবে এই হোটেল খোঁজার দরুণ একটা কাজ হয়ে গেল, আমাদের মোটামুটি শহরটা দেখা হয়ে গেল। এমনিতেই শীতের সকাল, তার উপর আমরা পৌছেছি ভোরে তাই শহর তখনো খুব একটা জেগে উঠে নি। শহরের ছোট রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকানের সারি, আর মাঝে মাঝে কিছু টিলা দেখা যাচ্ছিল।

হোটেলের রুম (খাতা কলমের কারণ, কয়েকদিন পরই এসাইনমেন্ট সাবমিশন ছিল)

ছোটেল খুঁজতে প্রায় ২ ঘন্টার মত সময় লেগে গেল। এমনেই যাত্রা-বিরতিতে কেউ নামি নাই। তাই হোটেলের ওয়াশরুমে হালকা লাইন ধরে গেল। এরপর সবাই ফ্রেশ হয়ে, কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। তারপর গেলাম নাস্তা করতে। নাস্তা করার পর হোটেল ফিরতে গিয়েই দেখি, হোটেলের পাশেই একটা বাজার আছে আর তার থেকে একটু গেলেই সাঙ্গু নদী। বাজারে হালকা ঘুরাঘুরি করে, সাঙ্গু নদীতে গিয়ে দাড়ালাম। নদীতে তখন একবারেই পানি নেই। সেখানে কিছু ছবি তুলে আবার হোটেলে ফিরলাম। হোটেলে ঢুকার আগে একটা চাঁদের গাড়ি ঠিক করলাম বিকালে শহরের আশে পাশে ঘুরার জন্য। বিকালে এসে আমাদের নিয়ে যাবে।

সাঙ্গু নদীর তীরে

মেঘলা

শহরের কাছেই একটা পর্যটন কেন্দ্র মেঘলা। পাহাড় তার সাথে ঝুলন্ত সেতু, কেবল কার, প্যাডেল বোট আর ছোট একটা চিড়িয়াখানা টাইপের আছে। পরিবার নিয়ে ঘুরার মত সুন্দর যায়গা। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরলাম ছবি তুললাম। এরপর আমাদের গন্তব্য হবে নীলাচল।

মেঘলার ঝুলন্ত ব্রিজে আমরা

আর একটা কথা না বললেই নয়, BMEIAN লিখা হুডি টা অনেক ছবিতেই দেখবেন। ডিপার্টমেন্টের (BME) প্রতি তীব্র ভালোবাসার টানে কয়দিন আগেই সবাই মিলে এটা কিনেছিলাম আমরা!!

নীলাচল

মেঘলার পর সেই একই গাড়িতে করে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য নীলাচল। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে অবস্থিত নীলাচল। নীলাচল আমার কাছে এভারেজ লেগেছে। এর কারণ অবশ্য আমরা শীতকালে গিয়েছিলাম তার জন্য হতে পারে। এখানে মেঘ নাকি বর্ষা, শরৎ আর হেমন্তে দেখা যায়। যদিও এই সময়েও অনেক লোক ছিল এখানে। ছবি তোলার যে বিখ্যাত স্পট আছে, সেখানে লাইন ধরে যাচ্ছিল একটু পর পর। আমরা এর মাঝেও কয়েকটা ছবি তুলে ফেলি।

নীলাচলে সবাই

এরপর আমরা আশে-পাশে একটু ঘুরে ফিরে দেখি। নীলাচলের পাহাড়ের চূড়া থেকে সুর্য অস্ত যাওয়া দেখে গাড়িতে করে ফিরে যাই হোটেলে।

নীলাচলের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি
নীলাচলে সূর্য অস্ত যাওয়ার মুহূর্ত (ছবিতে রিফাত)

আরেকটা কথা বলতে মনে নেই, আমরা স্বর্ণ মন্দিরে যেতে পারিনি। কোন একটা কারণে তখন টুরিস্টদের জন্য মন্দিরটির প্রবেশ বন্ধ ছিল।

রাতে ফ্রি খাওয়া

নীলাচল থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। ফিরে হালকা বিশ্রাম নিয়ে বের হই হালকা হাঁটাহাঁটি করতে আর রাতের খাবার খেতে। এর মাঝেই একজন পরিচিত মানুষের সাথে দেখা হয় আমাদের।

আমি যদি বলি, একজন সরকারি চাকুরিজীবীর বাসা ও পোস্টিং ছিল খুলনাতে। কিন্তু সে বান্দরবান ঘুরবে, তাই ইচ্ছা করে পোস্টিং এখানে নিয়েছে। তা কি কারো বিশ্বাস হবে?? আমার মনে হয় বিশ্বাস করা কঠিন। এমন একজন মানুষ হলেন, আমাদের বন্ধু রাশেদের খালাত বোন। সে সোনালী ব্যাংকের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। আমরা যাওয়ার কিছুদিন আগেই সে খুলনা থেকে বান্দরবান পোস্টিং নিয়েছে।

তার সাথে দেখা হওয়ার পর সে আমাদের সেখানকার সেনাবাহিনীর ক্যান্টিনে নিয়ে গেল। সেখানে খাওয়ার ফাঁকে তার সাথে টুকটাক কথা হচ্ছিল। সে বলল কিছুদিন আগেই নিজে একাই আলীকদমের পাহাড়ে গিয়ে ক্যাম্পিং করে এসেছে। বেশ সাহসী মহিলা বলা যায়। তার থেকে বিদায় নিয়ে হালকা হাঁটাহাঁটি করে রুমে ফিরলাম। রাতে বেশ খানিকক্ষণ আড্ডা দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কাল সকালে আবার থানচি যেতে হবে।

থানচির উদ্দেশ্যে যাত্রা

সকালে ঘুম ভাঙলো জলদি। শুনলাম গাড়ি এসে দাড়িয়ে আছে। জলদি তৈরি হয়ে নিচে নামলাম। এরপর গাড়ি থামিয়ে নাস্তা করে রওণা দিলাম থানচির উদ্দেশ্যে। আগের দিনের শহর ও এর আশেপাশের ঘুরাঘুরিটা আসলে আমাদের জন্য শিক্ষা সফরের মত ছিল। আজকে থেকেই আসল ট্যুর শুরু।

যারা কখনো পাহাড়ে গেছেন তাঁরা ভালো করেই জানেন পাহাড়ের সব থেকে সুন্দর দৃশ্য সকালেই দেখা যায়। আমরাও জীবনে প্রথম বারের মত আজকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে থানচির দিকে আগাতে থাকলাম। যত আগাতে থাকলাম গাড়ি থেকে নিচে তুলার মত মেঘের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছিল।

আমাদের বান্দরবান থেকে থানচি যাওয়ার পথে ৬ বার দাড়াতে হয়েছে। এর মাঝে ৩ বার দাঁড়িয়েছি শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নিজেদের তথ্য দেওয়ার জন্য। এ ছাড়া বাকি ৩ বার দাঁড়িয়েছি পাহাড় দেখতে। প্রথমেই একটা পুলিশ চেক পয়েন্টে দাঁড়ালাম। এখান থেকে নিচে অনেক সুন্দর মেঘ দেখা যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল সাদা ধোয়ার এক আস্তরণ।

পুলিশ চেকপয়েন্ট থেকে নিচের সাদা মেঘ

এখানের কাজ শেষে আমরা গিয়ে দাঁড়াই চিম্বুক পাহাড়ের ওখানে। বেশি ঘুরে দেখিনি, শুধু ছবি তুলে চলে এসেছি। এরপর সামনে গিয়ে একটা ভিউ পয়েন্টের মত আছে, সেখানে কিছু ছবি তুলে আবার চলতে শুরু করেছি।

চিম্বুক পাহাড়ে
পথের মাঝে এই ভিউ পয়েন্ট কিছু সময় ছিলাম আমরা

পাহাড়ে চাঁদের গাড়িই সব। এই গাড়িতে করেই যাত্রী যাতাযাত করে, পণ্য পরিবহন করে। সাজেক যাওয়ার সময় এক চাঁদের গাড়ির ড্রাইভার আমাকে বলেছিল, এসব গাড়িতে নাকি ট্রাকের ইঞ্জিল লাগানো হয়। তবে বাসও চলে কিছু। সেটায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো হয়নি। তবে কোন ট্রাক দেখিনি আমি। এই চাঁদের গাড়ির একটা সমস্যা হচ্ছে এটায় সামনা-সামনি সিট বসানো। তাই যাদের মোশন সিকনেস (motion sickness) আছে তাদের প্রচুর সমস্যা হয়। আমাদের মাঝে অনেকেরই বমি বমি ভাব হচ্ছিল। যাদের এ সমস্যা হচ্ছিল, তাদের আমরা একটু পর পর রোটেট করে ড্রাইভারের পাশের সিটে পাঠিয়ে দিচ্ছিলাম। তবে এর থেকেও বাচার একটা সহজ উপায় রয়েছে। সেটা হলো দাঁড়িয়ে যাওয়া। আর মাথা গাড়ির গতির দিকে রাখা। তাহলেই ঝামেলাটা কমে যায়।

থানচি

বান্দরবান থেকে থানচি যাওয়ার সব থেকে সুন্দর দৃশ্য গুলোর মাঝে ছিল মেঘের খেলা, ঠান্ডা বাতাস আর পাহাড়ের মাঝে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি করে বাঁক। এগুলোর মজা নিতে নিতে সকাল ৯-১০ টার মাঝে থানচি পৌছালাম। নামার পর আমাদের কাছে চলে এলো অভি। এই অভি হচ্ছে আগামী ৩ দিন, ২ রাতের গাইড আমাদের। ওই এসে সব ফর্মালিটিস শেষ করল।

একটা কথা বলে রাখা ভালো, থানচি এসেই নিজের ডিপার্টমেন্টের কিছু সিনিয়রের সাথে দেখা। তারাও আমাদের মত “খুম” দেখতে এসেছে। তাদের সাথে হালকা হাই/হ্যালো করে নিজেদের কাজে মনযোগ দিলাম।

থানচি থেকে একটা জিনিস কিনে নিলাম। একজোড়া জুতা। এই জুতা গুলো যে কি পরিমাণ উপকার করেছে আমাদের, তা বলে বুঝানো যাবে না!! অনেক সুন্দর গ্রিপ জুতা গুলোতে। এর কারণে পাহাড়ে উঠা-নামা আমাদের জন্য খুবই সহজ হয়ে গিয়েছিল। আর কিছু কাগজ-কলম। অনিক স্যার কিছু এসাইনমেন্ট দিয়েছিল। তাই করে অন-লাইনে জমা দিতে হবে।

গহীন অরণ্যে যাত্রা

আমাদের পরবর্তি গন্তব্য আমিয়াখুম ও নাফাখুম। স্থানীয় ভাষায় “খুম” মানে জলপ্রপাত। তো আমরা আসলে দুইটা ছোট্ট জলপ্রপাত দেখতে পাহাড়ে যাচ্ছি। থানচি থেকে আমিয়াখুম বা নাফাখুম যাওয়ার দুইটা প্রবেশ পথ রয়েছে।

১। থানচি → পদ্মঝিরি

২। থানচি → রেমাক্রি

আমরা প্রথম পথটা বাছাই করলাম। আমাদের আজকের টার্গেট থানচি → পদ্মঝিরি → নিকোলাস পাড়া। এই নিকোলাস পাড়া যার নামে, ঐও আমাদের সাথে আছে। অভির বন্ধু মনে হয়।

থানচি থেকে পদ্মঝিরি যাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নৌকা। আমরা দুইটা কাঠের নৌকা ভাড়া করলাম। সাথে নিলাম লাইফ জ্যাকেট। নৌকায় করে ৯ জন রওণা হওয়ার পর মনে হচ্ছিল, যা দেখি সবই ভালো লাগে। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে ছোট্ট একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে নৌকায় শুয়ে শুয়ে পাহাড় গুলো দেখতে সেই লাগছিল। এর মাঝে শীতের হালকা রোদও গায়ে লাগছে। রোদ পোহাতে পোহাতে দ্রুতই চলে এলাম পদ্মঝিরিতে।

থানচি থেকে পদ্মঝিরির পথে
অতিরিক্ত রোদ থেকে বাঁচার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা (ছবিতেঃ ফাহিম)

ছবিতে ফাহিমের পায়ে যে জুতা দেখছেন। এটাই সেই বিখ্যাত জুতা। নৌকা থেকে নামার পর এখানে কিছু দোকান দেখলাম, সেই দোকানে কিছু খেয়ে রওণা করলাম। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য নিকোলাস পাড়া।

পদ্মঝিরি → নিকোলাস পাড়া

আমরা আনুমানিক দুপুর ১-২ টার দিকে রওনা দিলাম পদ্মঝিরি থেকে। এরপর শুরু হলো আমাদের আসল পাহাড় ভ্রমণ। একটা কার্টুনের মাঝে গান আছে না হিন্দিতে, “পাহাড়ো কি নিচে, জঙ্গল কি পাড়……”। ঠিক তেমন কিছুর মাঝ দিয়ে যাচ্ছিলাম। এই বিশাল পাথর বেয়ে উপরে উঠতে হচ্ছে, এই আবার হাটু জল সমান পানিতে হাঁটতে হচ্ছে। আবার একটু পর পর টিলা টাইপের গ্রামের উপর উঠতে-নামতে হচ্ছে।

লাইফ জ্যাকেট সাথে নিয়ে রওণা দিলাম আমিয়াখুমের দিকে

এর মাঝে মাঝে, কিছু দোকান পাওয়া যাচ্ছিল যেখানে আমরা যাত্রা বিরতি দিচ্ছিলাম। সেখানে পানি আর সেদ্ধ ডিম খাচ্ছিলাম।

পথের মাঝের ছোট দোকান গুলোয়। এটা প্রথম দোকানের সামনে তোলা ছবি
এমন ছোট ছোট অসংখ্য জলের ধারা পার করতে হয়েছে আমাদের

এরকম সমতলের মাঝে চলতে চলতেই হুট করেই দেখা যেত বিশাল একটা পাথরের চুড়ায় উঠতে হবে। নিচে তার পানি। এরপর সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখা যেত পানিতে হাটতে হবে। এভাবেই চলছিল আমাদের পাহাড় যাত্রা।

আর সবার হাতে ছিল একটি করে লাঠি। লাঠি ছাড়া পাহাড়ে উঠা আমাদের জন্য কঠিন
পাথরের উপর হাঁটতে হাঁটতে আবার পানিতে নামো
পড়ে গেলেই বিপদ
এত কিছুর মাঝেও এমন সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল। এর ফলে খুব একটা খারাপ লাগছিল না।

২-৩ ঘন্টা হাটার পর শরীর ছেড়ে দিতে শুরু করলো সবারই। লক-ডাউনে সবাই বাসায় বসে থাকতে থাকতে শরীরে একটু দুর্বল হয়ে গিয়েছিল সবার। তাই এডাপ্ট করতে সমস্যা হচ্ছিল সবারই। বিকাল হতে হতে তাই সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই একটু পর পরই বিরত দিতে হচ্ছিল। বিরতির সাথে সাথেই সবাই ব্যাগের পিঠের পিছনে দিয়ে শুয়ে পড়তাম ঘাসের উপর। আর দুরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম এক মনে।

পিছিয়ে পড়া মেফতার জন্য অপেক্ষা করছি সবাই
ক্লান্ত সবাই

এই ক্লান্তিতে দ্রুত এনার্জি পাওয়ার জন্য কিছু খেজুর নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। পাহাড়ে গেলে আমার কাছে খেজুর একটা অতীব প্রয়োজনীয় খাবার মনে হয়েছে। তবে আমরা যে খেজুর নিয়ে গিয়েছিলাম, তার প্রতি আমাদের নজর কম ছিল। কারণ ফাহিম বাড়ি থেকে অনেক দামী খেজুর নিয়ে এসেছিল। পুরাটা পথ ফাহিম নিজে বয়ে নিয়ে গেছে তার ওই খেজুর আর আমাদের সবাই তাই নিয়ে খেয়েছি।

এত ক্লান্তির মাঝে একটা শান্তি ছিল। এত সুন্দর পাহাড় দেখতে পারতেছিলাম। ক্লান্তির মাঝে মনে হয় আরও বেশি সুন্দর লাগছিল পাহাড় গুলো। অবশ্য এর একটা কারণ থাকতে পারে, আমরা বাঙালিরা সারা জীবন সমতল দেখার কারণে হয়ত উঁচু কিছু দেখলেই ভালো লাগে। মনে দোলা দেয়।

বিরতির পর ছুটে চলা
বান্দরবানে এমন দৃশ্য খুবই সাধারণ

দিনের আলো কমতে শুরু করায়, আমাদের গাইড অভি একটু তাড়া দিচ্ছিলো যেন অন্ধকারের আগেই যত বেশি পথ শেষ করা যায়। তাই আমরাও হালকা গতি লাগালাম হাটায়। কিন্তু শরীর তখন ভালোই ক্লান্ত। তখন অনেকের শরীরের পেশিতে টান লাগা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

পেশিকে একটু সচল করার চেষ্টা

এভাবেই চলতে চলতে সন্ধ্যা হয়ে আসে প্রায়। সন্ধ্যার আগে আগে আমরা একটা দোকানে শেষ বারের মত দাঁড়াই। সেখানে পানি, ডিম ও পাহাড়ি পেঁপে খেয়ে আবার যাত্রা শুরু।

এখানের পেঁপে টা বেশ ভালো ছিল

এরপরের পুরো পথটা আমাদের যেতে হয়েছে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে। ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে হাঁটতে হয়েছে পুরাটা পথ। এর মাঝে যখন ক্লান্ত হয়ে যেতাম তখন সেখানেই শুয়ে পড়তাম। তখন যেহেতু পাহাড় দেখা যেত না, তাই আকাশের তাঁরা দেখতাম। আকাশে চাঁদ না থাকাতে পুরো আকাশ জুড়ে যেন এক তাঁরার মেলা বসেছিল। ছবিতে সেই তাঁরা তুলে ধরা যাবে না। শহুরে আলো না থাকায় আকাশটা বেশ সুন্দর লাগত। আমরা যখন যাত্রা একবারে শেষ দিকে চলে এসেছি তখন আরিয়ান বললো ওই আর যেতে পারবে না। আর রাশেদ ত অভিকে হেভি ঝারি। এত পথ কেন আনছে এই সেই। এই গোলমাল পরিবেশে অভির সাথে যে ছিল (নিকোলাস), ওই এসে আরিয়ানকে অনেকটা টেনেই নিয়ে যায়। পরে দেখা যায় গ্রামের একদম কাছে এসে কাহিনিটা শুরু করেছিল আরিয়ান আর রাশেদ। খুব বেশি হলে আর ৫ মিনিট লাগত আমাদের। সেই দুপুর প্রায় ২ টার দিকে যাত্রা শুরু করে রাত ৯ টায় আমরা এসে পৌছাই নিকোলাস পড়ায়। প্রায় ৭ ঘন্টা হাঁটতে হয়েছে এই পাহাড়ের ভিতর দিয়ে। রাতে ঘুমানোর আগে স্টেপ ট্র্যাকারে দেখলাম প্রায় ১০ কিলোমিটারের মত হেটেছি আমরা।

ফোনের ফ্ল্যাশ লাইটে চলছে অভিযান

গ্রামে পৌঁছে আমরা সবাই হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসে পড়লাম। এক টুকরা মুরগি, আলু ভর্তা, ডিম আর লাল জুম চালের ভাত। জন প্রতি ২৫০ টাকা। তবে এই অতিরিক্ত ঝাল খাবারও দ্রুত সবাই খেয়ে ফেলল। কারণ সবাই এত ক্লান্ত ছিল যে, কি খাচ্ছে তা নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না। আমাদের থাকার যায়গা হলো একটা জুম ঘরে। পাহাড়ের এইদিকে বেশির ভাগই জুম ঘর। হালকা মাচার উপর বাঁশ/কাঠ দিয়ে বানানো হয়। ক্লান্তি থাকায় সবাই দ্রুত ঘুমিয়েও গেল। শুধু জেগে রইলাম আমি, আজমাইন আর রিফাত। শুয়ে শুয়েই কিছুক্ষণ নিজেরা আড্ডা দিলাম। আর ফোন গুলো সব অভির কাছে দিলাম চার্জ দেওয়ার জন্য। এর মাঝেই শুনি রাশেদ স্বপ্নের মাঝে, “উউ উউ” করতেছে। হয়ত ভয় পাচ্ছিলো কোন কিছু নিয়ে। দুই একবার ডাক দিলাম। চুপ হয়ে গেল। এরপর শূকরের ঘোত ঘোত শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে গেলাম বাকি সবার মত।

জুম ঘরে, ঘুমানোর আগে

নিকোলাস পাড়া

শূকরের ঘোত ঘোত শব্দে ঘুম ভাঙলো আমার। বার বার শূকরের কথা বলছি, কারণ পাহাড়ে শূকর গৃহপালিত পশুর মত লালন-পালন করা হয়। আর যেহেতু জুম ঘর গুলো একটু উঁচু হয়, তাই শূকর গুলো এই জুম ঘর গুলোর নিচে চলা ফেরা করে আর ঘোত ঘোত শব্দ করে। তাই এই শব্দটা বার বার শুনতে হচ্ছিল।

ঝুম ঘর থেকে বের হয়েই যে দৃশ্যটা দেখবো সেটা ভাবিনি কখনো। এই নিকোলাস পাড়াটা একটা বেশ উঁচু পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত। এর কারণে এর চার পাশে পেঁজা তুলার মত মেঘ দেখা যাচ্ছিল। গত দিন রাস্তায় যে দৃশ্যটা দেখেছিলাম, সেটা এখানে জুম ঘরের দরজা থেকে বের হলেই দেখতে পারছিলাম।

এই ঘরেই রাতে ছিলাম আমরা
আমাদের রুমের সামনের দৃশ্য

উঠে হালকা ফ্রেশ হয়ে পাড়াটায় হালকা ঘুরে দেখলাম। ছোট ছোট ৫-৬ টা জুম ঘর। শীতের সকালে হালকা রোদ লাগাতে লাগাতে বাসায় ফোন দিলাম, কারণ এখান থেকেই ফোনের ২জি নেট পাওয়া যাচ্ছিল হালকা। বাসায় জানালাম ভালো আছি। এরপর খেয়ে রওণা দিলাম আমিয়াখুমের দিকে।

নিকোলাস পাড়ায় হাঁটাহাঁটি
এর কথাই এতক্ষণ বলছিলাম।
২৫০ টাকার প্লেটার

পরে শুনেছিলাম, ২০০ টাকা দিয়েও খাওয়া যায়। তবে সেখানে মুরগি দেয় না। আর ভাববেন না এটা পাহাড়ি মুরগি, পিওর ব্রয়লার মুরগি। আমরা খরচ বাঁচাতে দুই বেলা খাওয়া দাওয়া করতাম। হাঁটার উপর থাকতাম এই অজুহাতে দুপুরে না খেয়ে ডিম, পেঁপে এইসব কিনে খাওয়া হতো।

দেবতা পাহাড়

খাওয়া শেষ করেই আমিয়াখুমের দিকে রওণা হলাম আমরা। আমাদের জন্য এখন আমিয়াখুম দেখার শেষ বাধা ছিল দেবতা পাহাড়। এই পাহাড়ের পাদদেশেই আমিয়াখুম অবস্থিত। আর নিকোলাস পাড়া থেকে দেবতা পাহাড় খুব কাছে। তাই দেবতা পাহাড় পৌঁছাতে বেগ পেতে হলো না। সমস্যাটা শুরু হলো যখন পাহাড় ধরে নামতে শুরু করলাম। পাহাড়টা খুব বেশি মাত্রায় খাঁড়া। আমাদের মত আনাড়িদের জন্য খুবই বিপদসংকুল একটা পাহাড় এটা। এর মাঝে আমাদের গ্রুপের সবার সামনে যাচ্ছিল আরিয়ান। আরিয়ান কিছুদুর নেমে এতই ভয় পেল যে, আর আগাতে পারে না। পরে পেছনের গ্রুপের একজন গাইড এসে আরিয়ানকে ধরে ধরে পুরা পাহাড়টা নামায়। এর মাঝে সব একটা অবাক করা জিনিস লক্ষ করলাম, আমরা যেখানে এক পা দিতেই ভয় পাচ্ছি, এখানে পাহাড়ের কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে দৌড়ে নামছিল এই দেবতা পাহাড়। কনফিডেন্স আরও শেষ করে দিল এটা।

দেবতা পাহাড়ের উপর থেকে নিচের খাঁদ
নিজের পশ্চাৎদেশের উপর ভর দিয়ে নামছে আরিয়ান (সবার সামনে)
দেবতা পাহাড়ে এমন অনেক গুলো যায়গা আছে।

প্রায় ৩-৪ ঘন্টা সময় ধরে আস্তে আস্তে নামলাম দেবতা পাহাড় ধরে। পাহাড়ের পাদদেশের কাছাকাছি আসতেই পানির শব্দ পাচ্ছিলাম, নামার পর একবারে সামনে আমিয়াখুম। এটার উপর আগেই বেশি সময় ব্যয় করলাম না। আমিয়াখুমের পেছনেই একটা যায়গায় আছে। বাঁশের ভেলায় করে যেতে হয়। নামটা মনে নেই। খুব সম্ভবত ভেলাখুম। সেখানে আগে গেলাম। এটা বড় বড় পাথরের ভেতর দিয়ে একটা জলাশয়ের মত। নিচে বেশ গভীর। তবে পানি স্বচ্ছ। এর শেষ মাথায় পাথরের উপর দিয়ে উপচে পানি পড়ছে। এত টুকুই। তবে দেখতে ভালই লাগে।

ভেলাখুম ওইদিকে। এই বাঁশের ভেলা দিয়েই যেতে হয়।
ভেলায় করে যাচ্ছি ভেলাখুম
ভেলাখুমের মাঝে

আমিয়াখুম

ভেলাখুম দেখার পর আমাদের সবার মনযোগ চলে আসে আমিয়াখুমের উপরে। আমিয়াখুম দেখতে খুব সুন্দর। আমরা শীত কালে গেলেও পানি বেশ ভালোই আছে। সাথে উপর থেকে নিচে লাফ দেওয়ার একটা সুপ্ত ইচ্ছা। যদিও বেশির ভাগই সাহস করে উঠতে পারেনি। আমাদের মাঝে শুধু রাশেদ আর মেফতাই লাফ দিয়েছিল।

আমিয়াখুম

লাফ দিতে গিয়ে অবশ্য রাশেদ একটা ছোট ঘটনা ঘটায় ফেলে। উচ্চতা যেহেতু বেশি ছিল তাই এত উচ্চতা থেকে লাফ দেওয়ার কিছু নিয়ম আছে। তার মাঝে একটা হচ্ছে, প্রথম পা বা হাত এমন ভাবে ফেলতে হবে যেন সার্ফেস টেনশনটা ভেঙ্গে ইজিলি শরীর ভেতরে চলে যায়। নাহলে শরীরের যে পার্ট সবার আগে পরবে তার উপরে বেশি প্রেসার পরে। আমার বন্ধু এসব তোয়াক্কা না করে এমন ভাবে লাফ দেয় যে, তার পশ্চাৎদেশ সবার আগে পড়ে। ফলাফল হালকা একটু ব্যথা। তবে ব্যথা এমন যায়গায় লেগেছে যে, আমাদের বেশি কিছু বলার অবকাশ পায় নি।

তবে লাফ না দিলেও সবাই মিলে হেভি একটা গোসল দিয়েছি আমিয়াখুমে নেমে। মুল জলপ্রপাত থেকে একটু সামনে গেলে, বেশ বড় কিছু পাথর দেখা যায়। ওখান দিয়ে ধরে ধরে নামা যায় জল প্রপাতের পানিতে। এখানে পানির স্রোতও অনেক কম। তাই খুব আরামে গোসল করা যায়। ভ্রমণের শুরুতে বলেছিলাম না, লাইফ জ্যাকেট গুলো নিয়ে রওণা হলাম। এখানে এসেই লাইফ জ্যাকেটের ব্যবহারটা করি আমরা। আমাদের মাঝে শুধু রাশেদ সাঁতার পারত আর মেফতা হালকা হালকা পারত। বাকি সবাই লাইফ জ্যাকেট পরেই নেমেছিলাম আমরা।

আমিয়াখুমে গোসল

আগের দিন সারাদিন ধুলাবালিতে থেকে এই গোসলটা শরীরের জন্য অনেক শান্তিদায়ক ছিল। তবে এখানের পানি খুবই ঠান্ডা। পুরা শরীর জমে যায় শুরুতে। পরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে আসে। গোসল করে সবাই কাপড় চেঞ্জ করে আবার উপরে উঠার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ছেলেদের একটা সুবিধা হলো, লুঙ্গি থাকলে সহজেই যেকোন যায়গায় কাপড় চেঞ্জ করে ফেলা যায়। কিন্তু আমাদের বন্ধু আরিয়ান লুঙ্গি ব্যবহার করে নিজের ভেজা প্যান্ট পরিবর্তন করতে অপারগ হয়ে ভেজা প্যান্টের উপর শুকনা প্যান্ট পরে ভিতরে থেকে ভেজা প্যান্ট বের করার জন্য বেশ টানাটানি করছিল। আরিয়ান সফল না হওয়ায়, তার সাথে একটু পর শুভ্র যুক্ত হয়ে টানাটানি করতে থাকে। এ দেখে আমরা এতটাই হাসাহাসি শুরু করেছিলাম যে, লাস্টে কিভাবে চেঞ্জ করছে তা দেখা হয় নি বা মনে নাই।

এরপর উঠার পালা। যারা পাহাড়ে গেছে, তাঁরা জানে পাহাড়ে নামার থেকে উঠা অনেক সোজা। তাই দেবতা পাহাড় নামতে যে সময় লেগেছে তার থেকে খুব অল্প সময়েই আমরা উঠে গেলাম। উঠেই বেশ কিছুক্ষণ মাটিতে শুয়ে থেকে দ্রুত চলে গেলাম নিকোলাস পাড়া। এখানে আমাদের কিছু ব্যগ ছিল এক্সট্রা। সেগুলো নিয়ে রওণা দিলাম নাফাখুম পাড়ার দিকে। আজকে রাত থাকব ওখানেই।

নিকোলাস পাড়া → নাফাখুম পাড়া

দেবতা পাহাড় থেকে ফিরতে ফিরতেই আমাদের দুপুর হয়ে গিয়েছিল। তাই নাফাখুম পাড়ার দিকে রওনা হওয়ার কিছুক্ষণের মাঝেই সন্ধ্যা হয়ে যায়। আর আগের রাতের মতই এই অন্ধকারে আমাদের বেশ খানিকটা পথ হাটতে হয়। রাতে হাঁটার সব থেকে বড় সমস্যাটা হলো এখানে রিস্ক অনেক বেশি। বিশাল বিশাল পাথরের উপরে হেটে হেটে যেতে হয়। পাশেই খাঁদ। পরলেই ১৫-২০ ফিট নিচে পরে যেতে হবে। এর মাঝেও ভীষণ দ্রুত আমরা হেটেছি। যারা সামনে থাকত, এরা একটু পর পর পিছন ফিরে বলত সবাই আছিস নাকি।

নাফাখুমের পথে
নাফাখুমের পথে যাত্রাবিরতি
এই রকমের পথের ভেতর দিয়ে রাতেও অন্ধকারে যেতে হয়েছে

আমাদের ট্যুরের সব থেকে মজার বিষয় হচ্ছে খুচরা কথা। সবাই কথা বলতে বলতে চলা হয়। তাই অন্য রকম আবহ তৈরি হয়ে যায় এই ক্লান্তিকর যাত্রার মাঝেও। নাফাখুম যাওয়ার সময়ের সব থেকে মজার ঘটনা হয় রাশেদ ওরফে “বন্ধু”র সাথে। আমি, আজমাইন আর বন্ধু হাটছিলাম সবার পেছনে। এই সময় আজমাইন বলে, বন্ধু তোমার ওই গোপন ঘটনাটা রিফাতকে বলা হয় নাই। ওকেও বলা দরকার। বন্ধু শুরুতে রাজি হচ্ছিল না। পরে আজমাইন বলে, “রিফাত ত আমাদেরই লোক”। এটা শুনার পর বন্ধু আর কিছু বলে না। পরে আজমাইন রিফাতকে সামনে ডেকে এনে সব কিছু বলে। কিন্তু সরল বন্ধু জানে না এই জিনিসটা কিছুদিন পর থেকে সবার মুখে মুখে চলে যাবে।

নাফাখুম পাড়া

আমরা নাফাখুম পাড়ায় পৌঁছাই রাত ৮ টার দিকে। ওখানে গিয়েই নাফাখুমের পানিতেই হাত মুখ ধুচ্ছিলাম সবাই। আমরা সবাই খুশি এত আগে চলে আসছি। কারণ যাত্রার শুরুতেই অভি আমাদের বলেছিল রাত ১১ টার মত বাজবে। তাই সবাই খুব দ্রুত হাটছিলাম পুরোটা পথ। এত জলদি আসতে পেরে খুব ভালো লাগছিল। কিন্তু এই সুখটা বেশিক্ষণ থাকে নাই। সবাই ভুল থেকে শিক্ষা না নিলেও, আমাদের গাইড অভি নিয়েছিল। আগের দিন বেশি দেরি হওয়ার কারণে অনেক হাঙ্গামা করেছিল রাশেদ। এই জন্য তাই আজকে ও আগেই ২ ঘন্টা বেশি বলে দিয়েছে। যেন কেউ ওর সাথে ঘাপলা করতে না পারে। নাফাখুম পৌঁছে অভি এই কাহিনি আমাদের বলে। ভালো একটা ফাইজলামির শিকার হয়ে গেলাম খাওয়া দাওয়া করার আগেই। খাওয়া দাওয়া করে খানিকটা কথা বলে দ্রুত ঘুম।

নাফাখুমে খাওয়া-দাওয়া চলছে
জুম ঘরে ঘুম (নাফাখুম পাড়ায়)

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। তবে আজকে ঘোত ঘোত শব্দ ছাড়াই ঘুম থেকে উঠেছি। এরপর খেয়ে রওণা হবো রেমাক্রির দিকে। তার আগে নাফাখুমের সাথে টুকটাক কয়েকটা ছবি তুললাম আমরা। এর মাঝেই এক মুরুব্বির সাথে কথা হচ্ছিল। বয়স ৫০-৬০ এর মাঝে হবে। জামাই-মেয়ের সাথে এসেছে। কথায় যা বুঝলাম, জামাই মেয়ে জোর করেই এনেছে ঘুরতে। আমাদের কাছে জিজ্ঞাস করলো সামনের পথ কেমন দূর্গম। আমরা দেবতা পাহাড়ের কাহিনি বলার পর, আঙ্কেল বলল, আমি বাবা এখান থেকেই চলে যাব। সামনে আর যাচ্ছি না। আঙ্কেলকে ভয়ের মাঝে রেখে রেমাক্রির পথে হাটা শুরু করলাম আমরা।

নাফাখুম থেকে বিদায় নেওয়ার আগে

নাফাখুম → রেমাক্রি → থানচি

এ যাত্রাটা তুলনা মুলক অনেক সহজ। রাস্তাটায় খুব একটা বেশি পাহাড়ে উঠা-নামা নেই। তাই খুব দ্রুত পথ শেষ হচ্ছিল। মাঝে কুয়েটের “অনেক সিনিয়র” এক ভাই এর সাথে দেখা। ভাই তার কলিগদের সাথে নাফাখুম যাচ্ছে। তার সাথে হালকা কথা বলে আবার হাটা শুরু করলাম। তবে এই যাত্রার আমাদের মুল আলোচনায় ছিল, আমরা কি রোমায় যাব নাকি বাড়ি ফিরে যাব। আমরা টুকটাক খোজ খবর নিয়ে যা দেখলাম যদি ৪০০০ টাকায় থানচি থেকে রোমার একটা গাড়ি পাওয়া যায় তবে পকেটের উপরে চাপ না ফেলেই ঘুরে আসা যাবে। অভিও আমাদের অভয় দিচ্ছিল যে গাড়ি পাওয়া যাবে। ওর একটা সুবিধা ছিল এখানে, ওইও রোমা যাবে ওর কাজে, তাই যদি আমরা গাড়ি পেয়ে যাই তাহলে ওই ফ্রি তে রোমা চলে যেতে পারবে। সবার এই উইন উইন সিচুয়েশন খুঁজতে খুঁজতে চলে এলাম রেমাক্রি। সেখান থেকে আগেই ঠিক করে থাকা নৌকায় করে চলে গেলাম থানচি। সেই একই নদী পথ ধরে।

রেমাক্রি থেকে ফেরার পথে
"খুম" দেখা শেষে। উপরে যে ঘর-বাড়ি দেখছেন সেটাই থানচি।

আবারো থানচি

থানচি পৌছে, অভির টাকা দিয়ে সাজ্জাদ গাড়ির খোঁজ লাগানো শুরু করলো। কিছু গাড়ি ছিল, এরা ৫-৬ হাজার চাচ্ছিল রোমা যেতে। আমরা তখন ধরেই নিয়েছিলাম, রোমা আর এইবার হবে না। এর মাঝে অভি আমাদের বলল, চাইলে নৌকা দিয়েও যাওয়া যায়। অভিই আমাদের নিয়ে যেতে চাইলো। তখন বুঝিনি ওই কেন নিয়ে যেতে চাচ্ছিল। সেটা একটু পর বুঝতে পারি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, আমরা একটা গাড়ি পেয়ে গেলাম, যেটা রোমা ফিরে যাচ্ছিল। ওর গাড়ি ফাঁকা যাচ্ছিল। তাই আমাদের ৩ হাজারেই নিয়ে যাবে। শুনে আমরা সেই খুশি। যেখানে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম ৪ হাজারের নিচে গাড়িই পাওয়া যাবে না। সেখানে ৩ হাজারে গাড়ি পেয়ে গেলাম। দ্রুত সবাই উঠে পড়লাম গাড়িতে। গাড়ি ছুটে চলল রোমার পথে।

থানচি → রোমা

গাড়ি চলতে শুরু করার পর যেটা জানতে পারলাম, আমাদের ৫ টার আগে রোমায় পৌঁছাতে হবে। এরপর রোমা থেকে বগালেকে আর টুরিস্ট গাড়ি উঠতে বা নামতে দেওয়া হয় না। তাই গাড়িও ছুটলো ঝড়ের বেগে। এই পথটা এতই জোরে গাড়ি চলেছে যে সবাই বেশ ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ি।

বান্দরবানে একটা যায়গা আছে, Y-জংশন বলে। এখানে ৩ টা রাস্তা আছে। একটা বান্দরবান শহরের দিকে, একটা রোমা এবং আরেকটি থানচির দিকে যায়। আমরা থানচি থেকে এখানে এসে নাস্তা করে করে রোমার দিকে রওণা দেই। এখানে একটা আর্মি চেকপোস্ট আছে। এখানে সবার পরিচয় দিতে হয়।

বান্দরবান যে টুরিস্ট স্পট গুলো আছে, সাধারণত এসব যায়গায় যেতে গাইড লাগে। আমাদের সাথে যেমন ছিল অভি। কিন্তু এই গাইডদেরও নিজেস্ব এলাকা আছে। কিন্তু আমাদের অভি বলেছিল, ঐ আমাদের নিয়ে বগালেক ঘুরাতে পারবে। আমরাও তাই বিশ্বাস করে ওকে নিয়েই যাচ্ছিলাম। কিন্তু আমাদের এই ভুল ভাঙে রোমার আগে একটা আর্মি চেকপোস্টে। এখানে গিয়েই আর্মির সাথে যখন কথা বলছিলাম, তখন অভির নাম শুনে চিনতে পারল না। পরে ওরে নিয়ে গেলাম আর্মির ডিউটি অফিসারের কাছে। তখন ওকে দুইটা প্রশ্ন করতেই দেখলাম ওই একবারে চুপ মেরে গেল। আর এই চেকপোস্টটাকে বাইপাস করার জন্যই অভি আমাদের নদী পথে রোমা নিয়ে যেতে চাচ্ছিল, যেন আর্মির সাথে দেখা না হয়। পরে আর্মির তরফ থেকেই আমাদের একজন গাইডের সাথে যোগাযোগ করে দিল। যে লোকটা আমাদের হেল্প করছিল, তার বাড়ি শেরপুরে। আমার পাশের জেলার লোক হওয়ায়, অনেক আন্তরিকতার সাথে সব কাজ করে দেয়। এরপর আমরা দ্রুত সব কাজ শেষ করে রওণা দিয়ে দেই।

রোমা

খুবই ছোট একটা শহর রোমা। রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও সামান্য। ছোট ছোট দোকান আর কিছু কটেজ টাইপের আছে থাকার জন্য। রোমা গিয়ে আমাদের সাথে উঠে আমাদের গাইড অমল/কমল দা। তার নাম আসলে কি ছিল এটা নিয়ে আমরা তখনই কনফিউজড ছিলাম, এখনো আছি। তাই আমাদের মাঝে তাকে কেউ অমল ডাকত, কেউ কমল ডাকত। বয়স্ক এক লোক। অনেক দিন ধরে টুরিস্ট হিসাবে কাজ করেন। যার ফলে এখানের সব যায়গার লোকদের সাথে তার ভালো পরিচয়। এই লোকের ব্যবহারও বেশ অমায়িক। রোমা থাকাকালীন প্রতিটা জিনিস সে নিজে করে দিয়েছে। আমাদের শুধু কখন কত টাকা দিতে হবে তাই বলে দিত। এ ছাড়া আমাদের কোন চিন্তা ছিল না।

রোমা গিয়ে আমরা গাড়ি পরিবর্তন করি। রোমা থেকে বগালেকের চাঁদের গাড়ি আলাদা। এখানেই আমরা বার্বিকিউ করার জন্য সব কিনে ফেলি। কারণ আমাদের টার্গেট বগালেক গিয়ে বার্বিকিউ করা। সব কিনে ৫ টার আগেই রোমা থেকে রওনা দেই বগালেকের দিকে।

রোমা → বগা লেক

রোমা থেকে বগালেকের জন্য যখন রওণা হলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রোমা থেকে বের হওয়ার আগেই একটা পুলিশের চেক পয়েন্ট আছে। সেখানে কয়েকজন নিজের ইচ্ছা মত নাম ঠিকানা লিখে আবার গাড়িতে উঠলাম।

বগালেকের পর থেকে কেওক্রাডং পর্যন্ত পুরোটা পথ আর্মি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এদিকের রাস্তা গুলো বেশ ভালো অবস্থায় ছিল। তবে একটু পর পর বেশ খাড়ি বেয়ে উঠতে হচ্ছিলো গাড়িকে। এসব যায়গায় গাড়িটা এত ভন ভন করছিল, মনে হচ্ছিল যেন ইঞ্জিন না বন্ধ হয় যায়। আর এখানে ইঞ্জিন বন্ধ হলে সত্যি কথা বলতে করার কিছুই নাই, আল্লাহর নাম নেওয়া ছাড়া। তারপরও গাড়িটা কোন মতে আমাদের নিয়ে বগালেক হাজির হলো, দিনের আলো হালকা থাকতে। সেখানেই একটা আর্মি চেক পোস্টের মত আছে। সেখানে নাম ঠিকানা লিখলাম।

বগালেকে যাওয়ার রাস্তা। ইঞ্জিন বন্ধ হলেই যেন সব শেষ।

বগালেক

গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিয়েছে তার পাশেই বগা লেক। সন্ধ্যার অল্প আলোতে খুব ভালো বুঝা না গেলেও, বেশ বড় একটা লেকই মনে হচ্ছিল। এরপর অমল দা আমাদের ফ্রেশ হতে নিয়ে যায় একটা যায়গায়। সেখানে ফ্রেশ হয়ে সুন্দর একটা জুম ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে। যেখানে অনেক লোকের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও, সে বলল, আমরা ছাড়া আপাতত আর কেউ থাকবে না এখানে। এখানে এসেই যে যার কাজ করছিল। কেউ এসাইনমেন্ট করছিল, কেউ হিসাব মিলাচ্ছিল। আবার কয়েকজন দিচ্ছিলাম আড্ডা। আমরা বিগত কয়েকদিন যেসব যায়গায় ঘুরছিলাম, তা ছিল দুর্গম। যার ফলে সেখানে টুরিস্ট ছিল খুবই কম। কিন্তু বগালেকে সড়ক যোগাযোগ ভালো থাকায়, এখানে অনেক গুলো ট্যুর গ্রুপ দেখতে পাচ্ছিলাম। এরাই কেউ কেউ গানের আসর বসিয়ে গান করছিল। ক্যাম্প ফায়ারের মত আগুন জ্বালিয়ে তার পাশে গোল হয়ে বসে গলা খুলে গান গাইতে দেখলাম একটা দলকে। একটু পর হাঁটতে বের হলাম। একদমই ছোট যায়গা এই বগালেক। কয়েকটা কটেজ টাইপের আছে। কটেজ গুলোতে দেখলাম অনেক ট্যুর গ্রুপের ব্যানার। কিছু কলেজের ব্যানারও দেখলাম। তবে অন্ধকার হয়ে যাওয়ায়, আশেপাশে খুব একটা ঘুরে দেখার সুযোগ ছিল না।

এসাইনমেন্ট করছে আরিয়ান

একটু পরই আমাদের গাইড কল দিয়ে জানালো বার্বিকিউ এর কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা চাইলে সেখানে যেতে পারি। কিছুক্ষণ পর আমরা গেলাম সেখানে। একেবারে বগালেকের পাশেই আগুন জ্বেলে বার্বিকিউ করছে অমল দা। আমাদের কিছুই করতে হয়নি। অমল দা নিজে মাংস কেটে ধুয়ে আগুন জ্বেলে সব করেছে। আর লুচি আগেই অর্ডার দেওয়া ছিল, আর্মিদের দ্বারা পরিচালিক একটা ক্যান্টিনে। এই ক্যান্টিন থেকে সকালের নাস্তাও পাওয়া যায়। তবে আগে অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। আমরা আগামীকাল সকালের খাবার এখানেই অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। রান্না হয়ে যাওয়ার পর, খেয়ে নিলাম আমরা। অমল দা আমাদের সাথে না খেয়ে, খাওয়া নিয়ে চলে গেল। আমরা নিজেদের মত খেয়ে জুম ঘরে চলে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম শুয়ে শুয়ে। এই কয়েকদিনের মাঝে আজকেই আমাদের সব থেকে কম পরিশ্রম হয়েছে। তাই সবাই বেশ খানিকটা চাঙ্গা ছিলাম। তাই আড্ডা চলেছিল বেশ খানিকক্ষণ সময় ধরে। এরপর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে গেলাম সবাই।

অমলদার সাথে আমরা
রান্নার পর খাওয়া-দাওয়া চলছে।

ভালো একটা ঘুম হলো আজ। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছোট-খাটো একটা কাহিনি ঘটে গেল। এক বন্ধু দাঁত মাজার ঝামেলা যেন না করতে হয়, তাই মাউথ ওয়াশ নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এটা সে গোপনে ব্যবহার করত। যেন কাউকে না দিতে হয়। আজকে সকাল ধরা পড়ার পর সবাই এক যোগে ব্যবহার করে নিলাম। এই সেই করে বের হলাম একটু বগা লেক দেখতে।

বগালেক ভালই বড়। ৩ দিকেই পাহাড় দিয়ে ঘেরা। এক পাশে খানিকটা সমতল (যেখানে আমরা ছিলাম), তার মাঝে লেক অবস্থিত। লেকের পাশেই বাধাই করা হাঁটার যায়গা আছে ছোট একটা। সেখানে বসাও যায়। তবে লেকে নেমে গোসল করা নিষেধ। আমরা ঘুরলাম হালকা, ছবিও তুললাম কিছু। এরপর রুমে গিয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। এরপর ব্যাগ খালি করে অপ্রয়োজনীয় জিনিস গুলো আলাদা করলাম। এগুলা আমরা এখানেই রেখে যাব। ফেরার সময় নিয়ে যাব। অমল দা ব্যাগ রাখার ব্যবস্থা করলেন। এরপর আগেই অর্ডার নেওয়া খাবার খেয়ে রওনা দিলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কেওক্রাডং এর দিকে।

লেকের পাশে বসে সকালের নাস্তা
বগালেক ও কুয়েট বিএমই
বগালেক ও আমরা (ছবিতে শুধু আমি নেই, কারণ ছবিটা আমার তোলা)

বগালেক → কেওক্রাডং

বগালেক থেকে কেওক্রাডং যাওয়া যায় দুই ভাবে।

  1. গাড়িতে করে

  2. পায়ে হেটে

আমরা দ্বিতীয় পথটাকে বেছে নিলাম। এরও কারণ ছিল, পাহাড় বেয়ে উঠায় থ্রিলিং বেশি আর আমরা যখন গিয়েছিলাম তখনও পুরো রাস্তাটা পাকা হয়নি। তাই মাটির রাস্তায় গাড়িতে করে যাওয়ার শখ আমাদের ছিল না। গত কয়েকদিনের মত আবার বাঁশের লাঠি হাতে রওণা দিলাম।

এখানে বলে রাখা ভালো, পায়ে হেটে উঠা আর গাড়িতে যাওয়ার রাস্তা ভিন্ন। কিছু দূর গিয়ে রাস্তা আলাদা হয়ে যায়। তাই হেটেও মজা। এই দুই রাস্তা আবার মিলে যায়, দার্জিলিং পাড়ায় গিয়ে। ওখান থেকে আবার একই রাস্তা ধরে কেওক্রাডং এ উঠতে হয়।

রাস্তা আলাদা হচ্ছে। আমরা ডান দিকে যাব।

কেওক্রাডং হেটে যাওয়ার মুল সুবিধাটা হচ্ছে পুরা রাস্তাটাই মোটামুটি গাছের ছায়ায় ঢাকা। যার ফলে রোদ লাগে কম। আর সব থেকে সুন্দর দিকটা হচ্ছে, আমরা যেহেতু একটু একটু করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরে উঠছি তাই উপর থেকে নিচের দৃশ্য গুলো সুন্দর দেখা যাচ্ছে। পুরো পথটা জুড়েই হাতের এক পাশে ছিল উঁচু মাটির টিলা, আরেক পাশ ফাঁকা। এই ফাঁকা পাশ দিয়েই আমরা পাহাড় দেখতে দেখতে আগাচ্ছিলাম।

কেওক্রাডং এর পথে
মাঝে মাঝে এমন পাথুরে কিছু যায়গা ছিল। এখানে এখন শুকনা থাকলেও, বৃষ্টির সময় পানি বয়ে যায়

থানচির দিকে যেমন পাহাড়ের ভেতর দোকান ছিল এখানেও তেমন দোকান ছিল। তবে এই দোকান গুলো ছিল ভাসমান। মানে হাতে করে এনে জাস্ট বসে আছে। সন্ধ্যা হলে আবার সব নিয়ে চলে যাবে। তবে এইবার আমাদের খুব বেশি একটা থামতে হয়নি। কারণ থানচির দিকের মত বাজে ছিল না রাস্তাটুকু। খুব সহজেই উঠা যায় এমন পথ। আমরা তাও মাঝে কয়েকবার দাঁড়িয়েছি গরমের কারণে। মাঝে মাঝে কিছু যায়গায় গাছ না থাকায় তীব্র রোদ লাগছিল। আর এসব যায়গায় ধুলাও ছিল প্রচুর।

পথের মাঝে এমন বসার যায়গা ছিল। আবার এর পেছনেই ছিল খাঁদ। সুন্দর লাগত অনেক
কেওক্রাডং-এ যাওয়ার পথে (ছবিতে মেফতা)

দুপুর ১টার দিকে আমরা দার্জিলিং পাড়ায় এসে পৌছালাম। গ্রামের একদম শুরুর ঘরটা নিলাম আমরা। এখান থেকে কেওক্রাডং বেশি দূর না। ৩০-৬০ মিনিটের মত হাটলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু কেওক্রাডং-এর থেকে এখানে খাবার ও থাকা দুইটাই সস্তা, তাই আমরা এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।

দার্জিলিং পাড়া

দার্জিলিং পাড়াটা সুন্দর গোছানো একটা গ্রাম। আমরা যে রুমটা নিয়েছিলাম, তার পাশেই একটা দোকান। সেখানে সুন্দর আড্ডা দেওয়া যায়। আর সব থেকে ভালো জিনিস হলো এখানে পানির অভাব নাই। মানে গোসল করা যায় খুব আরামেই। কোন ঝরনা বা কিছুর মাধ্যমে পানি আনে হয়ত। আমরা এত কিছু নিয়ে মাথা ঘামালাম না। দ্রুত গোসল শুরু করে দিলাম। প্রায় ৩-৪ দিন ধরে শান্তি মত গোসল দিতে পারিনি। তার উপর মাত্রই ৩-৪ ঘন্টা পাহাড় বেয়ে এসে শরীর এমনেই ক্লান্ত। এর মাঝে সেই ঠান্ডা পানি পেয়ে, সবাই সেই একটা গোসল দিলাম। গোসল দিয়েই সেই দোকানে গিয়ে খেয়ে নিলাম। খেয়ে রুমে এসে হালকা রেস্ট নিচ্ছিলাম। কারণ একটু পরই আমাদের আবার কেওক্রাডং উঠতে হবে।

দুপুর ২/৩ টার দিকে আমরা রওণা দিলাম কেওক্রাডং এর উদ্দেশ্যে। যেহেতু বেশি দূর না, আমরা হেলে দুলেই আগাচ্ছিলাম। তাই যেতে খানিকটা দেরিই হয়ে যায়। তাই পাহাড়ের চুড়ায় বেশিক্ষণ থাকার সুযোগ হয়নি। যাই হোক, আমরা উঠতে লাগলাম ধীরে ধীরে। দুই একবার দাঁড়ালাম মাঝে। একদম শেষ বিকালে গিয়ে পৌছালাম কেওক্রাডং এ।

কেওক্রাডং

কেওক্রাডং দেশের দ্বিতীয় উচ্চতম চূড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা প্রায় ১২৩০ মিটার। চুড়ার উপরে গেলে দেখা যাবে বেশ কিছু যায়গা কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে। এখানেই এখন কটেজ গুলো ছিল। আমরা ওখানের হ্যালিপ্যাডে গিয়ে কিছু ছবি তুললাম, এরপর সবাই বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। এর মাঝে আর্মির এক লোক এসে সবাইকে এক সাথে করে, কিছু কথা বলল। সে বলল, রাতে বেলা নাকি সাপ-বিচ্ছু টাইপের কিছু থাকে। এর থেকে সাবধানে থাকতে বলল। এরপর সুর্যের অস্ত যাওয়া দেখে দ্রুত নামতে শুরু করলাম।

কেওক্রাডং-এ সুর্যাস্ত
পাহাড়ের চূড়ার কটেজ

আবার দার্জিলিং পাড়া

চূড়া থেকে নেমে, হাত মুখ ধুয়ে, রুমের পাশের দোকানে গিয়ে বসলাম। সেখানে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম। আর আমি ফোন দিলাম আমার স্টুডেন্টকে। ওদের বলে আসছি, ৩ দিনের মধ্যে যাব। আর এদিকে ৭ দিন হয়ে গেছে, আমার কোন খোঁজ নাই। এরপর বাসায় ফোন দিলাম। তারপর খাবার খেয়ে রুমে চলে গেলাম। এত দিনের ট্যুরের মাঝে এই রাতেই আমরা সেই একটা আসর বসালাম। আসর এতই জমে গেল যে, রাত ২ টার সময় একজন এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলে, দাদা একটু আস্তে। পরে এই সেই করতে করতে ঘুম দিলাম।

সকালে উঠেই দেখি সবাই ভীষণ ক্ষেপে আছে। কারণ আরিয়ান বাইরে থেকে তালা মেরে দিয়ে, একাই ঘুরতে গেছে। ফোনও ধরতেছে না বা নেটওয়ার্কের কারণে যাচ্ছে না। এদিকে সবাই যাবে ওয়াশরুমে। রুমের জানালা দিয়ে বের হয়ে যাবে সেই সু্যোগও নাই, কারণ রুমটা অনেকখানি উঁচু। পড়লে নিশ্চিত হাড় ভাঙবে। এই ভাবে কিছুক্ষণ চলার পর আরিয়ানকে দেখা গেল। পরে রুমে এনে কিছুক্ষণ ঝারি চলল। পরে শুনছিলাম, আরিয়ান স্থানীয় এক মেয়েকে দেখার জন্য আমাদের সবাইকে তালা দিয়ে চলে গেছে।

আজকে সকালে খাবার হিসাবে, বাঁশের ভেতর রান্না করা মুরগি খাব। আগেই অর্ডার করা ছিল। খাওয়ার পর মনে হলো আহামরি কিছু না। এরপর ব্যাগ পত্র গুছিয়ে রওণা দিলাম বগালেকের উদ্দেশ্যে।

দার্জিলিং পাড়ার এই দোকানেই আমরা খাওয়া-দাওয়া করতাম।

বগালেক → রোমা → বান্দরবান → ঢাকা

দার্জিলিং পাড়া থেকে সেই আগের পথ ধরে বগালেক পৌছালাম। সেখান থেকে সব ব্যাগ গুছিয়ে গাড়ি নিয়ে রোমার উদ্দেশ্যে রওণা হলাম। অন্য একটা গ্রুপের ৩-৪ জন আমাদের সাথে রোমা পর্যন্ত এসেছিল এবার, তাদের গাড়ির সমস্যার কারণে। এরপর আমরা সেই গাড়িতে করে বান্দরবান পৌছালাম।

যেদিন বান্দরবান এসে পৌছাই সেদিন খুব সম্ভবত ১৩ তারিখ। কারণ এক বন্ধু খুব তাড়া দিচ্ছিলো, ১৪ তারিখ তাকে তার বাবুর কাছে যেতে হবে। যদিও আমাদের টিকিট আগেই কাটা ছিল, তারপরও আমাদের মাঝে একটু জলদি ভাব কাজ করছিল। কারণ পরের দিন বান্দরবানে স্থানীয় কোন নির্বাচন ছিল। তাই যদি বিকালের মাঝে না বের হতে পারি তাহলে আরও দুই দিন থাকতে হবে। পরে অবশ্য আমরা সঠিক সময়েই এসে পৌছাই বান্দরবান। আর আমার বন্ধুও তার বাবুর সাথে দেখা করার জন্য আলাদা হয়ে চলে যায়। আর আমরা বাকি সবাই অপেক্ষা করতে থাকি বাস কাউন্টারে। আমাদের বাস ৬ টায় ছেড়ে যাবে।

এই ফাঁকা টাইমে সবাই বান্দরবানের বাজারে যায়। এখান থেকে শাল, আঁচার, জুতা আরও অনেক কিছুই কিনে নিয়ে আসে। যথা সময়ে বাস ছাড়ার পর সবাই সাথে সাথে ঘুমে পরে যাই। শরীর এত ক্লান্ত ছিল যে কই আছি কিছুই মনে নেই।

তবে মজার একটা কাহিনি হয় যাত্রা বিরতিতে এসে। যাত্রা বিরতিতে এসে রাশেদ হুট করে আবিষ্কার করে, ওর কেনা শাল, আঁচার এইসব কিছুই নেই। এবং রাশেদ ধরেই নেয় আমরা ফাজলামো করার জন্য ওর ব্যাগ থেকে লুকিয়ে রাখছি। আর রাশেদের কিছু হারালেই, ওর প্রথম সন্দেহ যায় রিফাতের উপর। এরপর সাজ্জাদের উপর। এই সন্দেহের বশে রাশেদ ওদের ব্যাগ গুলা পর্যন্ত চেক করে। তারপর বুঝতে পারে যে, আসলে ওগুলা বাস কাউন্টারেই রেখে আসছে। তারপরও ওই দাবি করে আমাদের জন্যই নাকি ওইসব ফেলে আসছে।

শেষ রাতের দিকে ঢাকা পৌঁছাই আমরা। এখানে পৌঁছে আমি চলে যাই, বসাকের সাথে ওর ভাই-এর বাসায়। বাকিরা যে যার মত বাড়ির পথে হাটে। আমি আর বসাক ওইদিন রাতের বাসে করে জামালপুর পৌঁছাই।

যদি খেয়াল করে দেখেন, এই ট্যুরের কোথাও আমরা এক রাতের বেশি থাকি নাই। প্রতিদিন সকালে উঠেই, ছুটেছি নতুন যায়গার দিকে। এর মুল কারণ ছিল টাকা। কোথাও এক রাত বেশি থাকার সুযোগ ছিল না। এই ট্যুর থেকে ফিরে আসার পর, অনেক বার ভাবছি যে আবার সবাই মিলে দার্জিলিং পাড়ায় গিয়ে থাকব। কিন্তু আজ প্রায় ৫ বছর হয়ে গেছে, আর যাওয়া হয় নাই। খুব সম্ভবত সামনেও আর সুযোগ হবে না, কারণ সবাই এখন কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। তাই কারো হাতেই আর আগের মত সময় নাই। তবে এত কিছুর মাঝেও একটা জিনিস ভাবলে ভালো লাগে যে, মাত্র ৬ হাজার টাকা হাতে নিয়ে সেদিন বোকার মত ৭ দিনের জন্য পাহাড়ে চলে গিয়েছিলাম।

— নিলয়

আমাদের ট্যুরের ভিডিও

বান্দরবান ট্যুর preview 1বান্দরবান ট্যুর preview 2বান্দরবান ট্যুর preview 3বান্দরবান ট্যুর preview 4

Photos

বান্দরবান ট্যুর

সকল ছবি একসাথে দেখতে

// Newsletter

Get New Blog Updates

Join the list and I will email you when a new post goes live.

← All PostsPortfolio →