← All Posts
kuet bmekuet bme '18kuet bme 18evanescent 18

স্মৃতির ফাঁকে কুয়েট (পর্ব ৩)

কুয়েট আমার জীবনের সব থেকে রঙিন অংশ। এই রঙিন জীবনের কিছু অংশকে ব্লগে তুলে রাখার প্রয়াসের ৩য় পর্ব এটি।

Jaied Bin Mahmud22 min read
স্মৃতির ফাঁকে কুয়েট (পর্ব ৩)

কুয়েট নিয়ে স্মৃতিচারণের দ্বিতীয় ব্লগ।

আফসার ম্যানশন

২য় বর্ষের শেষের দিকেই আমরা সবাই উঠে যাই আফসার ম্যানশনে। কুয়েটের আশে-পাশে যে বাসা গুলো আছে সেগুলো থেকে তুলনামুলক দূরেই এই বাসা। তাই ভাড়া একটু কম ছিল এই বাসার। আমি, পিয়াস, আজমাইন, রিফাত আর রাশেদ থাকতাম এক ফ্ল্যাটে। পাশেই আরেকটা ফ্ল্যাটে থাকত আরিয়ান, মেফতা, ফাহিম, সাজ্জাদ, সিফাত আর স্মরণ। আর অভিষেক তখনো তার পুরানো বাসায় রয়ে গেছে। কারণ কিছুদিনের মাঝেই সে হোস্টেলে উঠে যাবে।

আমাদের ফ্ল্যাট দুটো ছিল ৪ তলায়। আমি আর পিয়াস শুরুতে এখানে উঠতে চাইনি। পরে সবার সাথে থাকার জন্য নিজের বাসা ছেড়ে চলে আসি এখানে। তাই আমাদের স্থান হয়েছিল ড্রয়িং রুমে। আমি আর পিয়াস বিশাল ড্রয়িং রুমের দুই কোণায় দুইটা চৌকি পেতে থাকা শুরু করি। ড্রয়িং রুমে থাকার সমস্যা ছিল দুইটা। প্রথমত এখানে কোন জানালা না থাকায় গরম তুলনামুলক বেশি ছিল। আর এখানে প্রাইভেসি বলে কিছু ছিল না। যেমন আমার বেডের পাশেই ছিল একটা বেসিং। তবে এই সমস্যা গুলোকে কখনো সমস্যা বলে মনে হয়নি। পরে এই ড্রয়িং রুমেই আমরা রান্না করা শুরু করি। একটা মাল্টিপারপাস পরিবেশ বলা যায়। এই বাসার প্রায় প্রতিটা স্পেসই আমরা ব্যবহার করছিলাম মনে হয়। যেমন রান্না ঘরে আমার কম্পিউটার সেটাপ করেছিলাম। আবার এই রান্না ঘরেই দরকার হলেই রান্নার কাজে ব্যবহার হতো।

আফসার ম্যানশনের আমাদের জীবন ছিল খুবই সরল। সকালে উঠতাম রিফাত বা পিয়াসের ডাকে। উঠে দেখতাম এরা রেডি। আমরা যারা বাকি আছি এরা ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে পাশের ফ্ল্যাটে যেতাম। ওখানে আবার সবার আগে উঠতো আমিনুল। আমিনুল উঠে সবাইকে ডেকে তুলতো। এই ফ্ল্যাট থেকে রিফাত গিয়ে ওদের ডাকতে যেতো বা ওই ফ্ল্যাট থেকে আমিনুল আসত আমাদের ডাকতে। যেদিন যে আগে রেডি হতো সেই অনুযায়ী ডাকাডাকি চলত। এরপর ১১ জনের বিশাল বহর নিয়ে চলতাম ভার্সিটির দিকে। বিশাল বহর বলার কারণ হলো ডিপার্টমেন্টে লোকই মাত্র ৩০ জন। সেখানে প্রায় অর্ধেক মানুষ যাচ্ছি এক বাসা থেকে। এরপর ক্লাস/ল্যাব করে ছুটি হতো ১ঃ১০ এ। ক্লাস থেকে ছুটে যেতাম হোস্টেলে দুপুরের খাবার খেতে। এরপরই মুল সমস্যাটার শুরু। কারণ যদি ল্যাব থাকত ২ঃ৩০ থেকে তাহলে আমাদের যাওয়ার যায়গা ছিল না। বাসায় গিয়ে ৪ তলায় উঠতে উঠতে দেখা যাবে ২ঃ০০ বেজে গেছে। তাই ১০-২০ মিনিটের রেস্টের জন্য এত কষ্ট করাটা ছিল বোকামি। তাই আমরা একেক দিন একেক যায়গায় থাকতাম। কেউ লাইব্রেরি কেউ হলের অন্য কারো রুমে। এই ভাবেই চলছিল আমাদের জীবন। তবে এই সরল জীবনের মাঝে ছোট্ট একটা চাপ ছিল। সাধারণত কুয়েটের একটি সেমিস্টার চলত ১৩ সপ্তাহ ধরে। কিন্তু করোনার কারণে আমরা পিছিয়ে গিয়েছিলাম বলে, কুয়েট সিদ্ধান্ত নেয় আমাদের সেমিস্টার গুলো ১১ সপ্তাহে শেষ হবে। তাই ক্লাস-ল্যাব-সিটি গুলোর ভালো চাপ ছিল আমাদের উপর। এটা অবশ্য এক বছরই চলে। পরে আবার যেই লাউ সেই কদু।

ক্লাসে নিয়মিত ঘুমাতো রাশেদ

দুপুরে খাওয়ার পরি যদি ল্যাব থাকত তাহলে এভাবেই ছন্নছড়ার মত থাকতাম নাহলে চলে যেতাম বাসায়। বাসায় গিয়ে যে যার মত বিকালটা কাটিয়ে আবার রাত ৮ টার দিকে দল বেধে চলে যেতাম হোস্টেল, রাতের খাবার খেতে। আর যদি ল্যাব থাকত তবে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত ল্যাব করে, পকেট গেটে নাস্তা করে বাসায় চলে যেতাম সবাই। গিয়ে যে যার মত কিছু সময় কাটিয়ে আবার সেই হলে ফিরতাম খাওয়ার জন্য। মাঝে মাঝে রাতে আড্ডা হতো। তবে দুই ফ্ল্যাটে আলাদা আলাদাই আড্ডা গুলো বসত। মাঝে মাঝে এক হয়ে আড্ডা চলত। তবে সেটাও খুব কম। এরপর সকাল থেকে আবার সেই আগের রুটিন।

তবে ব্যতিক্রম ছিল বৃহঃস্পতিবার, কারণ এরপর দুইদিন ছিল সাপ্তাহিক বন্ধ। তাই যত রকমের আড্ডাবাজি চলত এই বৃহঃস্পতিবার রাতেই। সেই আড্ডা গুলোর কোন স্পেশালিটি ছিল না। পুরোটাই ছিল ননসেন্স কথাবার্তা। যা শুরু হত আমাদের ক্লাসের কোন ঘটনা থেকে এরপর জিওপলিটিক্স, রাজনীতি, সিনেমা, নিজেদের প্রেম জীবন। চলতেই থাকত। শীতের সময় এই টাইপের আড্ডার পর চলে যেতাম পকেট গেটে। সেখানে এই সময়টায় মোটামুটি ফাঁকা থাকত। গিয়ে কিছু খেয়ে আবার ফিরে আসতাম রুমে। মাঝে মাঝে আমাদের ড্রয়িং রুমের দুই বেডের ফাঁকা যায়গায় ক্রিকেট খেলার আয়োজন চলত।

গভীর রাতে ফাইজলামি করতে গিয়ে ফেলে দিয়েছে বেড থেকে

এই মেসে থাকাকালীন আমরা একটা প্রিন্টার কিনেছিলাম। এটা কোন বলার মত ঘটনা না হলেও আমাদের জন্য বেশ গুরুত্বপুর্ণ জিনিস ছিল এই প্রিন্টার। এই প্রিন্টারের উপর ভর করেই আমরা নানা রকমের ফাইজলামী করেছি। একটা ছোট্ট উদাহারণ দিলে জিনিসটা ভালো করে বুঝানো যাবে। আমাদের বন্ধু রাশেদের এক আত্মীয় কুয়েট আসবে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। সম্পর্কে সে রাশেদের ভাতিজা/ভাতিজি। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা হলেও, আমাদের মাঝে একজন শাকিব খানের সিনেমা “চাচ্চু আমার চাচ্চু” পোস্টারে রাশেদের ছবি ইডিট করে বসিয়ে তা প্রিন্ট করে পুরা বাসার নানা যায়গায় লাগিয়ে দেওয়া হলো। পাশাপাশি রাশেদের সাথেও সেই প্রিন্টেড পোস্টারের ছবি তোলা হলো। এমন বহু ঘটনা আছে যেখানে আমরা এই ধরণের ফাইজলামী করেছি।

সেই পোস্টার

এই প্রতিটি কাজই করা হতো একটুখানি আনন্দের জন্য। এর কোন বাজে উদ্দেশ্য না থাকলেও মাঝে মাঝে ধরা খেয়ে যেতাম আমরা। দেখা যেত বড় কোন ঝামেলা বেধে গেছে এই ধরণের ফাইজলামী করতে গিয়ে। তখন ড্যামেজ কন্ট্রোলও করতাম আমরা নিজ দায়িত্বে।

দেখতে দেখতে রোজা চলে আসে। কুয়েটে আগে রোজার শুরুতে বন্ধ দিলেও, করোনায় পিছিয়ে যাওয়ার কারণে এবার ১৫ দিন ক্লাস করিয়ে বন্ধ দিবে। এই রোজার মাঝে আমাদের জন্য সব থেকে বড় সমস্যাটা হলো সেহেরি খাওয়া। হলে সেহেরির সময় শুরু হতো রাত ২ঃ৩০ থেকে। আমরা ওই সময় মেস থেকে বের হয়ে নেমে চলে যেতাম হলে। তবে ক্লাসে যাওয়ার সময় লিডার রিফাত আর আমিনুল হলেও, সেহেরির ক্ষেত্রে লিডার ছিল পিয়াস। ২ঃ১০ এর দিকে পিয়াস রেডি হয়ে সবাইকে ডাকাডাকি করে রেডি করার কাজ শুরু করে দিত। আমরা ২ঃ৩০ থেকে ২ঃ৪০ এর মাঝে রওণা হয়ে যেতাম। সেই বিশাল ১১ জনের বহর নিয়ে। যাওয়াটা পিনিকে পিনিকে হলে ফিরে আসাটা ছিল অনেক জ্বালার। এই ভরা পেট নিয়ে প্রায় ১ কিলো হেটে এসে আবার ৪ তলায় উঠাটা বড়ই কষ্টকর ছিল। তবে করার কিছুই ছিল না। এরপর নামাজ পড়ে ঘুমাতে ঘুমাতে বেজে যেত ৫ টার কাছাকাছি। সকাল ৮ টা থেকে আবার ল্যাবও ছিল। এই ল্যাবটাও একটু প্যারা ছিল। এমনিতেই সকালে ঘুম হত কম তার উপর ল্যাবে গিয়েও শান্তি নাই। এই ল্যাবের এক স্যার প্রায় প্রতিদিন একটা না একটা প্রশ্ন করত। এবং মোটামুটি সবাইকে সেই প্রশ্ন করতে থাকত। এবং নিজের মনের মত উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সবাইকে দাঁড়িয়ে থাকা লাগত। সকালে ঘুম ঘুম চোখে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল খুবই বিরক্তিকর। এভাবেই ক্লাস ল্যাব করে বিকালে মেসে ফিরে শুরু হতো ইফতারের আয়োজন। প্রতিদিন দুইজন করে চলে যেতাম ফুলবাড়িগেট। সেখান থেকে নানা রকমের ইফতারের সামগ্রি কিনে নিয়ে আসার সময় তাঞ্জিলার বাসায় রাখা ঠান্ডা পানি নিয়ে আসতাম। তখন আমাদের বাসায় ফ্রিজ না থাকাতে ইফতারের সরবত করার জন্য তাঞ্জিলার বাসায় বোতল রাখা হত। যেন একটু আরামে রোজা শেষ করা যায়। এভাবেই রোজার ১৫ দিন শেষ করি আমরা।

আমাদের গ্রুপের কিছু লোকের মাঝে নিজেদের বাড়ির প্রতি তীব্র বৈরাগ্য ছিল। এটা আমার আর রিফাতের মাঝেই বেশি ছিল। তাই ক্লাস শেষ হলেও আমি, রিফাত আরও দুইএকজন থেকে যাই মেসেই। কুয়েটে ছুটি হয়ে গেলে হোস্টেলের ডাইনিং অফ হয়ে যায়। তাই আমরা মেসেই রান্না করে খাওয়া শুরু করি। রান্নার বেসিক জিনিসপত্র আমাদের কেনাই ছিল। সেই নিয়েই যুদ্ধে নেমে যাই। এভাবেই আরও ১০ দিন থাকার প্ল্যান হয়। তবে প্ল্যানে হালকা ভুল ছিল। আমরা বেশ কিছু জিনিস বেশি কিনে ফেলি। যেমন ১০ দিনের জন্য ৩০টা ডিমে কিনে আনা হয়। যেদিন চলে যাব তার আগের দিন দেখি আমি আর রিফাত আছি কিন্তু ডিম আছে ১৬ টা। ফ্রিজও নেই তাই বাসা থেকে ফিরে আসতে আসতে সব গুলো ডিম নষ্ট হবে। তাই দুইজন মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, যাই হোক সব ডিম শেষ করে যাব। ডিম ভাজি, পোস, ডিমের ভর্তা, ডিম সিদ্ধ নানা উপায়ে ১৬ টা ডিম দুইজন মিলে খেয়ে পরের দিন সকালে আমি বাসে উঠি আর রিফাত উঠে ট্রেনে। আমি বাসে পুরাটা রাস্তা একটা দোয়াই করছি আল্লাহ যাই হয়ে যাক, বাসে যেন কিছু না হয়। আল্লাহ দোয়া কবুল করছিল। বাসে কিছু হয় নাই।

সেই বিখ্যাত ডিম খাওয়ার প্রতিযোগিতা

আমাদের ফ্রেন্ড গ্রুপটার মাথা লিনিয়ারলি চলে নাই কখনো। তাই হুটহাট অনেক ঘুরাঘুরি করা হয়েছে। একদিন বিকালে কে যেন বলল, চল মাওয়া গিয়ে ইলিশ খেয়ে আসি। সাথে সাথে কয়েকজন রাজি হয়ে গেল। সবার মাঝে সব থেকে বেশি উৎসুক থাকত বন্ধু সাজ্জাদ। ও সাথে সাথেই ফোন দিয়ে বসলো রেন্ট-এ-কারে। খোঁজ নিয়ে জানা যায় রিজনেবল টাকায় মাওয়া যাওয়া যাবে। এরপর রাত ৮ টায় হলে খেয়ে রওনা দিলাম মাওয়ার উদ্দেশ্যে। সারা রাত ধরে খুলনা-মাওয়া-খুলনা চললো।

কুয়াকাটা

কুয়েটে মিড টার্ম না থাকলেও মাঝে মাঝে মিড টার্মের বন্ধ থাকত। এই সময়ে অনেকেই বাড়ি যেত। আবার অনেকেই থেকে যেত। ৩-১ এও আমরা এমন একটি বন্ধ পাই। বেশ কয়েকজন তখন আমরা মেসেই ছিলাম। বন্ধের শেষের দিকে শুনি সাজ্জাদ আমাদের জন্য লিচু আনবে। পরের দিন ভোরে সাজ্জাদ প্রায় ২০০০ লিচু নিয়ে মেসে হাজির। আমরা ঘুম থেকে উঠেই লিচু দিয়ে নাস্তা করি। এই লিচু খাওয়ার ফাঁকে কথায় কথায় কেউ একজন বলে বসে, চল কুয়াকাটা যাই। সাথে সাথে ৬ জন রাজিও হয়ে গেল। ২০০০ লিচু সেই একদিনে শেষ করে পরের দিন চলে গেলাম কুয়াকাটা। এবারও পেট-খারাপ হওয়ার একটা ভয় নিয়েই বাসে উঠি। তবে আল্লাহ সহায়, এবারও কিছু হয়নি বাসে।

BRTC-র লক্কর ঝক্কর এসি বাসে করে রওনা হলাম কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে। পৌছালাম বিকাল ৪ টার দিকে। কুয়াকাটা সৈকতের আগেই একটা বাঁধ দেওয়া। এই বাঁধের পাশেই ছোট-বড় অনেক হোটেল। থাকার জন্য এইসব হোটেল গুলোতেই খোজা শুরু করলাম। বাজেট কম থাকায় বেশির ভাগ হোটেলকেই বাদ দিতে হচ্ছিল। ঘন্টাখানেক খোঁজার পরও যখন কোন হোটেল ম্যানেজ করতে পারলাম না তখন একটা দোকানে বসলাম চা খেতে। সেই দোকানদারই আমাদের আবার অনেক ভেতরে একটা হোটেলের খোঁজ দিল। সেখানে দামাদামী করে ১২০০ টাকা/রাত একটা রুম নিলাম ৬ জনের জন্য। রুমটা খুবই এভারেজ, ৩ টা বড় বড় খাট পাশাপাশি পাতা। আর ছোট্ট একটা ওয়াশরুম। বাইরে একটা বারান্দা থাকলেও জুন মাসের গরম আর সাথে সাগরের আর্দ্রতায় সেখানে ১ মিনিটের বেশি দাঁড়ানো যেত না। তারপরও আমরা খুব খুশি ছিলাম রুমটা নিয়ে। ২০০ টাকা জন প্রতি হিসাবে রুম খারাপ ছিল না। এরপর সবাই একটু ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম দুপুরের খাবার খেতে। সেখানে গিয়েও একই সমস্যা। দাম বেশি খাবারের। অনেক খুঁজে একটা হোটেল বের করলাম যেখানে শুঁটকি ভর্তা দিয়ে মোটামুটি পেট ভরে খাওয়া যায়। সেখানেই খেয়ে একটু হাটলাম সাগর পার ধরে। আমরা যখন পৌঁছাই তখন কেবল ভাটা শুরু হয়েছে। যার কারণে সাগর অনেক দূরে চলে গিয়েছিল। জোয়ারের সময় সাগর প্রায় বাঁধের কাছে চলে আসে।

ঘোলাটে সময় (কুয়াকাটার হোটেলে)

সন্ধ্যায় আবার বের হয়ে সাগরের পাড়ের কাছের দোকান গুলোর খাবার খেতে যাই। এখানে সামুদ্রিক মাছ বিক্রির সিস্টেমটা একটু অন্য রকম। সাগর পাড়ের বাঁধের কাছেই ছোট ছোট ছাপড়া ঘর। এখানেই মাছ গুলো বিক্রির জন্য রাখা হয়। এই সব মাছের ভেতর থেকে দামাদামী করে মাছ কেনার পর ওরাই মাছ গুলো রান্না করে দেয়। আর মাছের সাথে রুটি/পরোটার ব্যবস্থার আছে। তবে সেটা আলাদা। দোকান গুলোর সামনেই পরোটা বিক্রি করে অনেক লোক। আর দোকান সামনেই ব্রেঞ্চ আর টেবিল পাতা। সেই টেবিলে বসেই খেতে হয়। এখানে খাওয়ার সব থেকে বড় ঝামেলা হলো বালি। সাগরের বাধটা একটু উঁচু হওয়ার কারণে সাগরের বাতাসে মাঝে মাঝেই বালু এসে পড়ে খাবার আর গায়ের উপর। তবে বাংলাদেশের মানুষের এসব জিনিসে ভ্রুক্ষেপ নাই বললেই চলে। সবাই আনন্দের সাথেই খাচ্ছে এখানে বসেই। খাওয়া শেষ করে মোটর সাইকেল খোজা শুরু করি। কুয়াকাটার আশে-পাশে ঘুরে দেখার জন্য মোটরসাইকেল ভালো একটি বাহন। বাইক ঠিক করে, আবার চলে যাই সাগরে। সাগরের একটা সমস্যা হলো বেশিক্ষণ দেখা যায় না। একটা সময় পর আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে। তারপরও সবার সাথে থাকার দরুণ খুব একটা সমস্যা হয়নি। সাগরে শুয়ে বসে থেকে রাত ১২ টার দিকে হোটেলে ফিরে আসি সবাই। খুব ভোরে বাইক এসে আমাদের নিয়ে যাবে তাই সবাই জলদি শুয়ে পড়লেও আড্ডা বাজি আমাদের রক্তে ছিল সব সময়। তাই দেখা গেলো যখন ঘুমাতে যাব তখন বাইক এসে কল দিচ্ছে। আমি ত যাবই না, অনেক জোর করে নিয়ে গেছে আমাকে।

প্রথম বার কুয়াকাটা

কুয়াকাটার বাইক দিয়ে ঘুরাটা বেশ মজার। আমরা যখন রওণা করি তখন আকাশে কালো মেঘ। এই মেঘ মাথায় নিয়ে এক পাশে সাগর আরেক পাশে বালির ও ছোট বনকে পাশে নিয়ে ছুটে চলছে বাইক। আমরা তখন কোনদিকে তাকাবো তাই নিয়ে চিন্তায়। একবার পাশের বিশাল সাগরের উপর কালো মেঘ দেখছি। আরেক পাশে বনের গাছ গুলোর দুলে চলছে বাতাসে। আর সামনে তাকালেই মুখে এসে ধাক্কা দিচ্ছে দমকা বাতাস। কিছুদুর এইভাবে যাওয়ার পর একটা ছোট্ট নদী পার হতে হয়। নৌকায় করে এই নদী পার হতে হতেই রোদ উঠে গেল। এরপর বাইক দিয়ে বেশ কিছু যায়গা ঘুরে ফিরে এলাম হোটেলে। এরপর কাপড় চেঞ্জ করে ছুটলাম সাগরের উদ্দেশ্যে। গোসল করতে হবে ত। গোসলের ফাঁকে আমি আর মেফতা গিয়ে একটা কেক কিনে আনলাম। রিফাতের জন্মদিন আজকে তাই। গোসলের ফাঁকে রিফাতকে এনে কংক্রিটের ব্লকের উপর কেক খেয়ে আবার নেমে পড়লাম গোসল করতে। এইসব করে সন্ধ্যার দিকে হোটেলে ফিরে আবার গেলাম সামুদ্রিক মাছের বাজারে।

সাগর পাড়ে রিফাতের জন্মদিন

আজকেই আমাদের শেষ দিন কুয়াকাটায়। তাই রাতের খাওয়া খেয়ে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরলাম সাগর ধরে। এরপর ক্লান্ত হয়ে চলে এলাম সাগর পারের ব্লক গুলোর উপর। সেখানেই শুয়ে শুয়ে সাগরের গর্জন শুনতে শুনতে কেউ ফোন চালাচ্ছিল, কেউ আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল। এই সেই করে রাত ২ টার পর ফিরে গেলাম রুমে। আজকে আসলেই সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম জলদি। নাহলে কালকে সকালের বাস মিস যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সব থেকে উঁচুতে উঠেছে কে?? (কুয়াকাটা)

হল জীবনের শুরু

যারা কুয়েট সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব পর্ব পড়েছেন তারা জানেন যে কুয়েটে প্রতি ডিপার্টমেন্টেই একটা করে এসোসিয়েশন আছে। সেই এসোসিয়েশনে ২য় বর্ষ থেকে প্রতি বর্ষের একজন করে ছাত্র প্রতিনিধি থাকে। ৩য় বর্ষের জন্য রয়েছে জেনারেল সেক্রেটারি পোস্টটি। আমরা ৩য় বর্ষে উঠার পর থেকে আমাদের থেকে কে হবে তার একটা আইডিয়া আমাদের সবারই ছিল। আমাদের খুব একটা মাথা ব্যথা না থাকলেও আমাদের গ্রুপের কয়েকজনের সাথে ওই বন্ধুটির সম্পর্ক বেশ খারাপ ছিল। বন্ধু বলার কারণ হলো এখন আর সেই রাগ নেই। তখনকার সাময়িক সমস্যা সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছে। আমরা কোন পক্ষই জিনিসটা ধরে রাখিনি। সে যাই হোক, সেই নির্বাচন যত কাছে আসতে থাকে আমাদের হলে উঠার সময়ও হয়ে আসে। কুয়েটে আবাসন সংকটের কারণে হলে সিট পেতে ভালই সময় লাগে। বড় হল গুলোতে ২য় বর্ষের শুরুর দিকে সিট পাওয়া গেলেও আমরা যে হলে যুক্ত ছিলাম সেখানে সিট পেতে সাধারণত ৩য় বর্ষে উঠে যায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ছাত্র রাজনীতি করলে একটু দ্রুত সিট পাওয়া যায় যদিও। আমরা যেহেতু কেউই রাজনীতি করতাম না তাই আমাদের সিট পাওয়ার সম্ভাবনা হয় ৩য় বর্ষের প্রায় মাঝামাঝি এসে। প্রায় একই সময় ডিপার্টমেন্টের নির্বাচন শুরু হবে হবে করে। আমার সেই রাজনৈতিক বন্ধু কোন ভাবেই চাচ্ছে না জেনারেল সেক্রেটারির পোস্টটি ছাড়তে। ওর এত আগ্রহ দেখে আমার বন্ধু মেফতা রাগ করে ঠিক করে ওর বিপক্ষে দাঁড়াবে। দুইজন দাঁড়ালে ভোটাভুটি হবে। আর ভোট হলে আমার রাজনীতি করা বন্ধুটি হারবে সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। তাই মেফতা যেন না দাঁড়ায় তার জন্য সে নানা ধরণের চেষ্টা করতে থাকে। প্রথমে আমাদের সবার সাথে একবার মিটমাটের চেষ্টা চালায়। এরপরও যখন কোন সমাধান না আসে তখন সেই বন্ধু হলের পলিটিক্যাল ভাইদের কাছে নিয়ে যায় আমাদের সবাইকে। এই ভাইদের সুবিধা ছিল তারা চাইলেই আমাদের হলে উঠা আটকাতে পারে। তাই তাদের বিপক্ষে কথা বলার কোন সুযোগ আমাদের ছিল না। হলের ভাইরাও সরাসরি কিছু না বলে, তোরা নিজেরা ঠিক কর কে দাঁড়াবি। কিন্তু দাঁড়াবি একজনই। এরপর আবার দরবার চলতে থাকে মেফতার সাথে আমার সেই বন্ধুর। এত ঝামেলার চলার পর মেফতা একটা শর্ত দেয় সেই বন্ধুকে, যদি আমাদের সবার হলে সিট ম্যানেজ করে দেওয়ার কথা দেয় তবে সে সরে দাঁড়াবে। আমার সেই বন্ধু রাজি হয়ে যায়। সাধারণত হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উঠতে হলে রাজনৈতিক সিনিয়র ভাইদের সাথে বেশ কয়েকবার দেখা করে হলে উঠতে হতো আমাদের সময়। কিন্তু আমাদের আর সে কাজ করতে হয়নি। আমরা একদিন গিয়ে দুই একজন ভাই এর সাথে দেখা করে এসেছিলাম। একদিন শুনি আমাদের ডাকতেছে হলে উঠার জন্য। এভাবেই শুরু হয় আমাদের হল জীবন।পলিটিক্স থাকাকালীন হলে উঠে একটা মজা ছিল। এখানে যেন প্রোভোস্টের কোন নিয়ন্ত্রনই ছিল না। যেদিন হলে উঠলাম তার কয়েকদিনের মাঝে হলের এক কর্মচারী রুমে এসে একটা ফর্ম দিয়ে গেল পুরণ করে দেওয়ার জন্য। আমরা আচ্ছা বলে ফর্মটা নিলাম কিন্তু জমা দিলাম না। এরপরও ৪-৫ বার একই ফর্ম দিয়েছিল আমাদের। কোনবারই জমা দেই নাই। হলে সিট পাওয়ার পর মূল খরচের সাথে ৫০ টাকা করে এক্সট্রা দিতে হত সিট ভাড়া হিসাবে। আমার বন্ধু রিফাত হলে উঠার ৬ মাস পর জানছে এই টাকা দিতে হয়। জানার পর টাকা দেওয়া শুরু করেছে। এর আগে এই ৫০ টাকাও দিত না।

হলে উঠার আগে মেসের শেষ আসর
প্রথমবারের মত হলে উঠা (১১৩ নাম্বার রুম)

হলে আমরা ৯ জন উঠলাম দুইটা রুমে। সাজ্জাদ আর অভিষেক আগেই উঠে গেছে। ওরা আলাদা রুমে। আমি, রিফাত, আজমাঈন, রাশেদ, পিয়াস আর আরিয়ান উঠলাম ১১৩ নাম্বার রুমে। আর মেফতা, সিফাত আর ফাহিম উঠলো ১০৩ নাম্বার রুমে। তখন ৪র্থ বর্ষ বাদে সব রুমেই ৬ জন করে ছিল। তবে ১০৩ রুমের ছেলে তিনটার কপাল ভালো। এদের রুমে যারা উঠে ৭ দিনের বেশি থাকে না। হয় অন্য রুমে চলে যায় বা বাড়ি চলে যায়। এতে করে এরা ৩ জনই ছিল বেশিরভাগ সময় এই রুমটাতে। আমাদের রুমে যেহেতু ৬ জন থাকা লাগছে। তাই স্পেস নিয়ে একটা ভালোই চিন্তা করতে হয়েছে। রুমের বাম দিক থেকে শুরু হয়ে ইংরেজি “L” শেপ ধরে খাট ফেলা হয়েছে। প্রথমে রাশেদ, আরিয়ান এরপর আবার বেড। এরপর আজমাঈনের বেড একটা ৯০ ডিগ্রি কোনে ফেলা হয়েছে। তারপর রিফাতের বেড আবার ৯০ ডিগ্রি একটা বাঁক দিয়ে ফেলা। এরপর একটু ফাঁকা যায়গা তারপর পিয়াসের বেড। এই ফাঁকা যায়গায় আমার আর রিফাতের চেয়ার টেবিল। আর রুমের বাকি যায়গায় সবার বেডের সামনে বা পাশে নিজের চেয়ার টেবিল রাখা। এর ভিতর দিয়ে অনেকটা পেট্রা নগরীর মত আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমাদের নিজের বেডে যেতে হত। আমরা যখন খান জাহান আলী হলে উঠি, তখন হলটির প্রায় ৫০ বছর ছুঁই ছুঁই করছে। পাশেই নতুন হল বানানো হচ্ছে। তাই হলের অবস্থা ভালই বাজে ছিল। ছাদের পলেস্তরা টুকটাক ভেঙে পড়ত। আর বেডের পাশের পলেস্তরা খসে খসে বিছানায় যেন বালু পড়তে না পারে তাই কালার কাগজ গাম দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। রুমের বাইরেও একই চিত্র। সব থেকে বাজে অবস্থা ছিল ওয়াশরুম গুলোর। পুরা স্যানিটেশন সিস্টেমটাই তার জীবনের শেষ পর্যায়ে ছিল। মাঝে মাঝেই দেখা যেত ওভার ফ্লো হয়ে উল্টো মল ভেসে উঠত। এখনো ভাবলে গাঁ শিউরে উঠে। তবে এত নেগেটিভের মাঝেও বেশ কিছু সুবিধা ছিল। বাসা ভাড়া ২০০০-৩০০০ একবারে ৫০ টাকায় চলে আসে। আর হলে খাওয়ার পর সরাসরি নিজের রুমে এসে বিছানায় এসে শুয়ে পড়তে পারতাম। এরমত আরামের তখন আসলেই কিছু ছিল না।

আমাদের ১১৩ নাম্বার রুমের সামনে

হলে উঠেই একটা বোকাচন্দ্রের মত কাজ করেছিলাম। সবাই ভাবছিলাম যে আমরা হলের পরিবেশে থাকতে পারব না। তাই দূরে একটা কম দামে বাসা ভাড়া নিয়ে রাখতে চাচ্ছিলাম। আমি আর মেফতা গিয়ে খুজেও এসেছিলাম। কিন্তু হলে উঠার ৭ দিনের মাঝে এইসব চিন্তা হাওয়ায় উড়ে যায়। হলে থাকা শুরুর পর থেকেও আমাদের জীবনের খুব একটা পরিবর্তন আসে নাই। সেই আগের রুটিন ক্লাস/ল্যাব-খাওয়া-রুম। তবে এখন খাওয়ার একটা মজা ছিল। পিয়াসের বেডটা যেখানে ছিল সেখান থেকে দেখা যেত হলের ডাইনিং এর দরজা খোলা হয়েছে নাকি হয়নি। ডাইনিং-এর সময় হলেই পিয়াস একটু পর পর সে দরজার দিকে চোখ রাখত, খোলার সাথে সাথে রুমের মাঝে হালকা চিল্লায়া বলত, চল ডাইনিং খুলছে। আমরা রুমে যারা থাকতাম ঐ সময় দৌড়ে চলে যাইতাম। এর কারণ একটাই, আগে গেলে বড় একটি মুরগির টুকরা প্রাপ্তির একটা ছোট্ট সম্ভাবনা থাকে। সেটার মজা অন্য রকম ছিল। এখন পেছন ফিরে তাকালে ভাবি একটু বড় মাংসের টুকরার জন্য কত দৌড়াদৌড়ি করা লাগছে। নিজের অজান্তেই একটা হাসি আসে। তবে এই উত্তেজনার সঙ্গী আরিয়ান খুব একটা হয় নাই। ওর খাবার প্রতি খুব একটা আগ্রহ ছিল না। খাবার পেলেই হইল ওর। তাই বেশির ভাগ দিনই আরিয়ান থাকলেও যেত না আমাদের সাথে। পরে গিয়ে খেত আরিয়ান।

হলে একই রুমে ৬ জন থাকার কারণে আড্ডাবাজিটা আগের থেকে বেশি হত। দেখা যেত কেউ একটা কথা বলতেছে, পুরা রুমের সবাই হাসতেছে। আমার পিসিটার সাথে ছোট্ট একটা সাউন্ডবক্স ছিল, সেটা দিয়ে গান চলত। এভাবেই সাধারণ দিন গুলো চলে যেত। হলে উঠার পর বাজে একটা অভ্যাস হলো আমার, আজমাঈন আর আরিয়ানের। সেটা হলো পকেট গেটে রাত ২ টায় খেতে যাওয়া। গরমের দিনের রুটিন ছিল রাত ১২ টায় পুকুরে গিয়ে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে আলোচনা করা। সেখানে মুলত আমি, পিয়াস আর আজমাঈন যেতাম। ঘন্টা খানেক সেখানে ঠান্ডা হয়ে এসে কাপড় চেঞ্জ করে বের হতাম পকেট গেটের উদ্দেশ্যে। এখানে পিয়াস যেত না। সঙ্গী হতো আরিয়ান। আর আমাদের রুমের সব থেকে টাইম মেইনটেইন করে চলা ছেলে রিফাত ততক্ষণে এক ঘুম দিয়ে ফেলত। মাঝে মাঝে অবশ্য আজমাইন ইচ্ছা করেই রিফাতকে ডেকে তুলে জিজ্ঞাস করত খাইতে যাবি নাকি। রিফাত বেশির ভাগ দিনই ঘুম জড়ানো গলায় বলত যাবে না। আমরা চলে যেতাম গরম গরম পরোটা বা নুডুলস খেতে। খাওয়া শেষে গরমের দিন হলে একটা সরবত আর ঠান্ডা দিন হলে চা খেয়ে রুমে ফিরে ঘুম। সকালে বরাবরের মতই রিফাত আর পিয়াস উঠে সবাইকে ডেকে তুলত। মাঝে মাঝে ১০৩ নাম্বার রুম থেকে ফাহিম চলে এসে তাড়া দিত সবাইকে। এভাবেই নতুন দিন শুরু হত আর রাতে পকেট গেটের চা/সরবত দিয়ে শেষ হত।

আমরা এই ৬ জন যারা ছিলাম। এদের মাঝে আমি, আজমাইন আর আরিয়ানের একাডেমিক জীবন নিয়ে বৈরাগ্যের শেষ ছিল না। তাই আমাদের তিন জনের জীবন মোটামুটি কোন লক্ষ ছাড়াই পার হত। পিয়াস টুকটাক ক্রিয়েটিভ কাজ করত। কিছু টাকা সেখান থেকে আসত। আর বাকি থাকে রাশেদ আর রিফাত। এরা দুইজনই একমাত্র দৈনিক পড়াশোনা করা ছাত্র। রুমে পড়াশোনা যে হয় এটার প্রমাণ দেওয়ার জন্যই ছিল এরা দুইজন। আমাদের বাকি ৪ জনের পড়াশোনা ছিল ল্যাব রিপোর্ট লিখা পর্যন্তই। আর ক্লাস টেস্ট থাকলে ১-২ ঘন্টার একটু পড়াশোনা। তবে এইসবের মাঝেই এক স্যার একটা ল্যাবে কোন কারণ ছাড়াই একটা ওয়েবসাইট বানাতে বলে। গ্রুপ প্রজেক্ট। আমি চিন্তা করি, আমার গ্রুপের টা আমি নিজেই বানাবো। আগেই কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং টুকটাক করার জন্য প্রোগ্রামিং নিয়ে মোটামুটি একটা আইডিয়া ছিল। সেই দিয়েই প্রজেক্টটা শুরু করি। এই যে শুরু এটা থেকেই আমি ধীরে ধীরে ওয়েব ডেভেলপমেন্টে একটা ভালো দখল এনে ফেলি। সেই অর্জিত জ্ঞান বিক্রি করেই আপাতত খাচ্ছি।

পড়াশোনার পরিবেশের পরিবর্তন হতো যখন সেমিস্টার ফাইনাল চলে আসত। সেমিস্টার ফাইনালের প্রথম পরীক্ষার আগে ৭ দিনের বন্ধ থাকে আর বাকি পরীক্ষা গুলোর আগে ৪-৫ দিন বন্ধ থাকে। এই বন্ধের শুরু থেকেই আমাদের রুমে পড়াশোনা গুছানো শুরু করে রিফাত, রাশেদ আর পিয়াস। আর বাকি তিনজনের জীবন আগের মতই চলতে থাকে। তবে আমাদের উদাসীনতা শেষ হত ২-৩ দিন আগে। তখন আমাদের টার্গেট থাকে প্রশ্ন এনালাইসিস করে কত বেশি মার্ক পাওয়া যায়। এইভাবে কোন মতে পড়ে এক্সাম দিয়ে আসতাম। এক্সাম শেষে রুমে এসে প্রথমে খাওয়া এরপর কঠিন একটা ঘুম। রিফাতকে দেখতাম এই দিন রাত থেকেই পুরাতন শীট সব গুছিয়ে রেখে পরের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা ৩ চদু পরবর্তি ২ দিনের রেস্টের জন্য রেখে দিয়েছি। তাই পড়াশোনা বাদে বাকি সব হবে। এইভাবে পরীক্ষা দেওয়ার ফলাফল গুলোই অনুমিত। আমরা এই তিনই জনই ৩য় বর্ষে খুবই বাজে রেজাল্ট করে গেছি। পাশ করার পর আজমাঈন আমাকে একদিন বলতেছিল, তুই আর আমি পাশ করছি মানে কুয়েটে ফেল করা কঠিন।

পুরাতন খাজা হলের রিডিং রুম (এক্সামের সময়)

এই ৩য় বর্ষেই আমাদের অনেকেই প্রেম ভেঙেছে আবার নতুন প্রেম শুরুও হয়েছে। সবই হয়েছে আমরা পুরাতন হলে থাকাকালীন। তবে এইসব ভাঙা গড়ার খেলার মাঝে আমাদের পিনিক নেওয়া বাদ যেত না। তবে এই পিনিকটা আমরা শুধু মেফতার সাথেই নেই নি। কোন একটা কারণে ওর প্রতি আমরা দয়া করেছিলাম। এখন ভাবতে পারেন কতই বা ফাজলামো করা সম্ভব। তার একটা উদাহারণ দিলেই জিনিসটা সহজ হয়ে যাবে। আমার বন্ধু রিফাতের সাথে একটা রমণীর বেশ খাতির ছিল। সেই রমণী রিফাতে প্রতি তীব্র মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে রিফাতকে জানায় তার এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। ওকে যেন ভুলে যায়। আমার বন্ধুর মাথায় হাত। দেখেই বুঝা যেত ঝামেলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বন্ধু। যেহেতু বন্ধুর অনেক কষ্ট হচ্ছে, ভালো বন্ধু হিসাবে মেন্টাল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য আমি আর আজমাঈন নিজ ইচ্ছায় অংশগ্রহণ করি। একটু পরপর রিফাতকে হাসিমুখে জিজ্ঞাস করতাম, এই রিফাত কি হয়েছে বল। আরও বলতাম আমাদের কাছে বল, অন্য কাউকে বলবো না। রিফাত কোন ভাবেই তখন এইসব বলবে না। আমরাও কোন উপায় না পেয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। একদিন রিফাতের ফোন থেকে মেয়েকে মেসেজ দিলাম। সাথে মেয়ের কয়েকটা পোস্টে লাভ ইমোজি কমেন্ট করলাম। রিফাত নিজেও ফেসবুক কম চালায়। যার ফলে ওর নিজেরও জানতে বেশ কিছুদিন লাগছে। একদিন দেখি রিফাত ঘুমন্ত আজমাঈনের বুকের উপর বসে থেকে জিজ্ঞাস করতেছে, তুই এটা কি করছিস?? তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে রিফাত আমাদের এই কাহিনি জানতে পারছে। ঘটনা এখানে শেষ হলেও পারত। কিন্তু শেষ না হয়ে বরং সামনে গেছে। এই মূল কাহিনি যখন চলতেছে, তখন শীতকাল। শীতের এক রাতে রিফাত তার স্বভাব মত আগে আগে ঘুমিয়ে গেছে। আমরা বাকিরা জেগে আছি। আমাদের রুমে সাজ্জাদ ঘুরতে এসেছে। এসে বলতেছে,

— ও রিফাত ঘুমায়া গেছে

— আমরা বললাম, দাড়াও একটু।

পরে রিফাতকে গভীর ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞাস করলাম, রিফাত মন খারাপ কেন?? সমস্যা থাকলে আমাদের বলতে পারিস। এইবার আর রিফাত নিতে পারে নাই। শীতের মাঝে হাফ প্যান্ট আর একটা গেঞ্জি পড়ে আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে বের হয়ে গেছে রুম থেকে। ঘটনা অনুধাবন করতে পেরে আমরাও পিছনে দৌড়ে গেলাম। পরে দেখি শহীদ মিনারে দাড়ায়া আছে একা একা। পরে কাপড় এনে আমি, আজমাইন, সাজ্জাদ আর রিফাত মিলে একটা আড্ডা দিলাম। দিয়ে রুমে ফিরে গেলাম। কিছুদিন পর জানতে পারছি মেয়েটা রিফাতকে হালকা টাইট করার জন্য এইসব করছে। রিফাত মেন্টাল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য পরে অবশ্য আমাদের অনেক দোষ দিয়েছে অনেক।

হলে উঠার পর সব থেকে সঠিক ভাবে পালন করা হতো জন্মদিন। সব জন্মদিনে একটা কেক এনে হলের আমাদের সবাইকে ডেকে এনে কাটা হতো। থাকত গিফট (ভালো-খারাপ দুটোই)। আর বিশেষ বিশেষ মানুষের জন্য থাকত ডিমের আয়োজন। যেমন রিফাত আর মেফতার জন্মদিনে ছিল ডিম আর ময়দার ব্যবস্থা। সবার ক্ষেত্রে এইসব করা হতো না। মেফতার জন্মদিনের দিন একটা ট্র্যাজেডি প্রায় হয়েই গিয়েছিল। জন্মদিনের কাজ শেষ করে সবাই গেছি পুকুরে। এই পুকুরে নেমে লাইট অফ করে দিয়ে লাফাচ্ছি। এর মাঝে বসাক নিজের ভারসাম্য রাখতে না পেরে আমাকে আর আরিয়ানকে টান দিয়ে নিজেও পরে গেল আমাদেরও ফেলে দিল। এই অন্ধকারে কেউ কিচ্ছু দেখতেছে না। চারাদিকে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। ১০-১৫ সেকেন্ড পর কে যেন আমাকে তুলল। তার আগেই কে যেন আরিয়ান আর বসাককে তুলে ফেলছে। আমাকে পাচ্ছিলো না দেখে মোটামুটি সব গুলোর অবস্থা যায় যায় হয়ে গেছিলো। আমি পানির নিচে আশা ছেড়ে দিছিলাম। ধরে নিছিলাম শেষ এইবার (আগেও একবার এমন হইছিল আমার সাথে)। এই ঘটনার পর থেকে আমি পুকুরে নামা বাদ দিয়ে দেই।

অভির জন্মদিন

৩-২ চলার মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে যায় ডিপার্টমেন্টাল ট্যুরের প্রস্তুতি। এইবার আয়োজক আমরা। তাই আগ্রহ অনেক বেশি। তবে এই সময়টাতে আমি একটা প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য এই আয়োজনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাইনি। এ আয়োজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখভাল করেছে সাজ্জাদ। সাথে ছিল মাধব, রিফাত, পিয়াস আর রাশেদ। এরাই দৌড়াদৌড়িটা বেশি করেছে। এর পাশাপাশি বাকিরা নিজেদের যায়গা থেকে যতটুকু প্রয়োজন ছিল সেই সাহায্য করেছে। সুন্দরবনের মজাটা হলো লঞ্চে বসে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে ঘুরা। আর সময় মত খাবার খাওয়া। আর যখন কোন পয়েন্টে পৌঁছানো হয় সেখানে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করা। আগেই একবার সুন্দরবন যাওয়ার কারণে এইবার সুন্দরবন নিয়ে উত্তেজনা আমাদের মাঝে একটু কমই ছিল। আমাদের এই পুরো ট্যুরটাই ছিল জোড়াতালি দেওয়া। অনেক কষ্টে নামানো হয়েছে।

সুন্দরবন ট্যুরের গেঞ্জি আনা হয়েছে
সুন্দরবন

ধীরে ধীরে শীত কাল চলে আসে। ৩-২ তখন শেষের দিকে। এমনই একটা সাধারণ শীতের রাতে আমি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। পিসি অফ করে ওয়াশরুমে গিয়ে ঘুমাতে যাব। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখি করিডোরের অপর পাশের ওয়াশরুম দেখা যাচ্ছে না। যেটা ১০ মিনিট আগেও স্বাভাবিক দেখা যাচ্ছিল। আমি রুমে গিয়ে সবাইকে ঘুম থেকে তুললাম এই গভীর রাতে। শুরুতে কেউই আমার কথা বিশ্বাস করতে চাচ্ছিল না, যেটা খুবই স্বাভাবিক। জীবনে অনেক ফাজলামো করেছি এদের সাথে। তারপরও সবাইকে তুলে নিয়ে গেলাম। গিয়ে এরাও অবাক। এরপর শুরু হলো ক্যাম্পাসে হাঁটাহাঁটি। এরপর গিয়ে বসলাম পকেট গেটের টং দোকানে। সেখানেই আড্ডায় আড্ডায় রাতটা পার করে খুব ভোরে রুমে গিয়ে ঘুম দিলাম।

শীতের রাতে হাঁটাহাঁটি শুরু
শীতের ভোরে পকেট গেটে

কিছুদিন পরেই আবার আরেকটি সেমিস্টার ফাইনাল চলে আসে। ৩-২ এর সেমিস্টার ফাইনাল আমাদের শেষ হয় ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারিতে। এই সেমিস্টার ফাইনালটাও আমাদের তিনজনের কাছে আগের গুলোর মতই গেছে। তবে এইবার আমি একটু চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ফলাফল আগের মতই। তবে এক্সাম দিয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করেই ওইদিন রাতেই রওণা হই উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে। টার্গেট তেতুলিয়া থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ঘুরে দেখা।

চলবে……

শেষ বর্ষের আগের বছর preview 1শেষ বর্ষের আগের বছর preview 2শেষ বর্ষের আগের বছর preview 3শেষ বর্ষের আগের বছর preview 4

Photos

শেষ বর্ষের আগের বছর

// Newsletter

Get New Blog Updates

Join the list and I will email you when a new post goes live.

← All PostsPortfolio →