← All Posts
kuet bme 18evanescent 18rag tour

বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর

মানুষ জীবনের অনেক কিছুই ভুলে যায়। তার মাঝেও কিছু স্মৃতি তার ভিতর থেকে যায়। আমার কাছে র‍্যাগ ট্যুর এমন একটা স্মৃতি।

Jaied Bin Mahmud37 min read
বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর

এই ব্লগ লিখা শুরু করে, Rag Tour লিখে গুগলে সার্চ দিলাম। কিন্তু সদুত্তর পেলাম না। তবে Rag Day Celebration নিয়ে কিছু সংজ্ঞা পাওয়া যায়। গুগল জিমিনির মতে, Rag Day Celebration মানে একাডেমিক জীবনের শেষ দিনকে উৎযাপন করাকে বুঝায়। যারা ভার্সিটিতে পড়েন বা পড়েছেন, তারা এমন র‍্যাগ সেলিব্রেশন অনেক দেখেছেন। এখন স্কুল কলেজেও এটা দেখা যাচ্ছে। তবে এর কোন প্রশাসনিক ভিত্তি নেই। মানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গরজে করে থাকে। র‍্যাগ ট্যুরটাও অনেকেটা সেলিব্রেশনের মতই। তবে এখানে নাচ-গানের বদলে দেশ-বিদেশ ঘুরে দেখা হয়, ভার্সিটির জীবনের শেষ দিকে। তবে এর প্রশাসনিক ভিত্তি রয়েছে। মানে এখানে ডিপার্টমেন্ট থেকে কয়েকজন শিক্ষক অংশগ্রহণ করে ও ভার্সিটি থেকে নামমাত্র কিছু টাকাও প্রদান করে।

আমরা যখন কুয়েটে ক্লাস শুরু করি, তখন থেকে দেখতাম ফাইনাল ইয়ারের ব্যাচ র‍্যাগ ট্যুরে যাচ্ছে। তখন জিনিসটাকে নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে নিজেদের পড়াশোনা শেষের দিকে এসে, ভালই উত্তেজনা ছিল র‍্যাগ ট্যুর নিয়ে। আমরা যখন নিজেদের অতীত নিয়ে চিন্তা করি, তখন সাধারণত নিজেদের সুন্দর স্মৃতি গুলোর কথাই মনে হয়। আমার এই সুন্দর স্মৃতির একটি হলো এই র‍্যাগ ট্যুর।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন যায়গায় যায় র‍্যাগ ট্যুরে। কেউ কেউ বিদেশ যায়। কুয়েটে আমরা থাকাকালীন কোন ব্যাচকে দেশের বাইরে যেতে দেখিনি। কুয়েটের সব ডিপার্টমেন্টই নির্দিষ্ট কিছু যায়গায় যায় র‍্যাগ ট্যুরের সময়। আমরাও অনেকেটা সেই একই পথ অনুসরণ করেছি।

পরিকল্পনা ও যাত্রা

আমরা র‍্যাগ ট্যুর যাই ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে। তবে র‍্যাগ ট্যুরের সাথে আরেকটি জিনিস থাকে আমাদের। সেটা হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর। এখানে আমরা দেশের যেকোন একটি/দুইটি প্রতিষ্ঠানে যাই যেখানে আমরা আমাদের নিজেদের ডিপার্টমেন্টের সাথে সম্পর্ক আছে এমন কোন কোম্পানি/রিসার্চ সেন্টারে গিয়ে একটু ঘুরে ফিরে দেখে আসি। যেন বাস্তব জীবনে আমাদের কাজ কি তার একটা ধারণা পাওয়া যায়। এটি সাধারণত একদিনের হয়ে থাকে। এর পরের দিন থেকে র‍্যাগ ট্যুর শুরু হয়।

এই সব কিছুর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে, থাকা খাওয়া সব কিছুর দায়িত্ব থাকে একজনের হাতে। সেটা আমাদের ডিপার্টমেন্টের ক্ষেত্রে থাকে ভিপির উপর (ভাইস প্রেসিডেন্ট)। আমাদের ব্যাচের ভিপি ছিল সাজ্জাদ। সাজ্জাদ অনেক মোটা ছেলে হলেও, ওর মেন্টালিটি ছিল আর্মির মত। মানে “No one falls behind” টাইপ। তাই যখন থেকে র‍্যাগ ট্যুরের পরিকল্পনা শুরু হয়েছে, সাজ্জাদ খুব করে চেষ্টা করেছে ডিপার্টমেন্টের সবাইকে নিয়ে যেতে। বরাবরের মত আমাদের গ্রুপের ১১ জন শুরু থেকে রাজি থাকলেও আমাদের ৩০ জনের বাকি কেউ খুব একটা রাজি ছিল না। এদের সবাইকে রাজি করানো জন্য সাজ্জাদ খুব চেষ্টা করেছে। তবে ফলাফল শুণ্য। ওই ১১ জন বাদে আরও ৫ জন নিজের কিছু সমস্যা কারণে যেতে চাচ্ছিল না। কিন্তু ওরা রাজি ছিল। এ বাদে শুধুমাত্র ১ জন সাজ্জাদের কথায় রাজি হয় ট্যুরে যাওয়ার জন্য। এত কষ্টের কোন ফল না পেয়ে, মনের দুঃখে সিটির (Class Test = C. T) আগের রাতে সে আমাদের ব্যাচের ফেসবুক গ্রুপে, বিশাল বড় রচনা লিখে পোস্ট করে। ওই পোস্ট যে উদ্দেশ্যে করেছিল, তার ফল না পেলেও আমাদের সবার থেকে ভালো বুলিং এর শিকার হয়েছিল সাজ্জাদ (আমরা ওই পোস্ট নিয়ে এখনো সাজ্জাদকে বুলিং করি মাঝে মাঝে।)।

সবাইকে রাজি করানোর পাশাপাশি, আরও দুইটি কাজ করতে হচ্ছিল সাজ্জাদকে। একটি হলো আমাদের সাথে কোন কোন টিচার যাবে, তা ঠিক করা। আর আমরা কোথায় কোথায় যাব, কোথায় থাকব এইসব ঠিক করা। কোথায় যাব এবং থাকব তা ঠিক করা মোটামুটি সহজ ছিল। থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে সাজ্জাদ একটা এজেন্সির সাথে কথা বলে। ওদের সাথে কথা বলার পর, যাওয়া-থাকা-খাওয়ার সমস্যাটা প্রায় ৯০% শেষ হয়ে গেল। সমস্যা বেঁধে গেল তখন অন্য যায়গায়। সাধারণত এইসব ট্যুরে দুইজন শিক্ষক যায়। আমাদের সাথে একজন শিক্ষক হিসাবে অমিত স্যার যাচ্ছে এটা মোটামুটি ঠিক হয়েই ছিল। সমস্যাটা বাঁধে অন্যজন কে হবে তা নিয়ে। আমাদের শিক্ষকদের মাঝে একজন খুব করে চাচ্ছিল আমাদের সাথে ট্যুরে যাবে। আমরা মনে মনে চাচ্ছিলাম সে যেন আমাদের সাথে না যায়। কিন্তু সরাসরি বলার মত কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তবে আমাদের বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। সেই শিক্ষক নিজেই আমাদের হাতে “কারণ” তুলে দেয়। একদিন ক্লাস চলাকালীন খুব ছোট্ট একটা জিনিসকে কাহিনি করে দরজা জোরে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। এরপর রুমে গিয়ে আমরা সাজ্জাদকে বললাম, ঐ স্যার গেলে র‍্যাগ ট্যুরে আমরা ১১ জন যাচ্ছিনা। আমরা আলাদা ট্যুর নামাবো, তাও ঐ স্যারের সাথে যাচ্ছিনা। সাজ্জাদ সেদিনই কুয়েটের তপ্ত বিকালে রওণা হলো ডিপার্টমেন্ট হেডের কাছে। গিয়ে কাহিনি খুলে বললো, স্যার শুনে ঐ স্যারকে বাদ দিয়ে বশির স্যারকে আমাদের সাথে দিয়ে দিল। আসলে যারা ভাবছেন খুব সহজেই বাদ দিতে পেরেছি, বিষয়টি আসলে তা নয়। ওই শিক্ষক কয়েকদিন আগেই, একটা বিশাল ধরা খেয়েছে ডিপার্টমেন্ট হেডের কাছে (নারী ঘটিত)। ঘটনাটা তখন না জানলেও কিছুদিন আগেই শুনলাম। তবে সেই শিক্ষক বাইরে খুব গরম দেখালেও তার মনটা অনেক নরম। অল্পতেই সে খুব কষ্ট পায়। আমরা তাকে বাদ দিয়ে ট্যুরে যাচ্ছি, এই সংবাদ জানার পর, দুইদিন তার কোন খোঁজ ছিল না। পরে শুনেছিলাম সে নাকি কষ্টে মেহেরপুর একা একা চলে গিয়েছিল। কষ্ট কমে যাওয়ার পর ফিরে এসেছে। এসবই শোনা কথা। সঠিক প্রমাণ নেই।

কে কে যাবে এবং কোথায় কোথায় যাব, এসব ঠিক হয়ে যাওয়ার পর আমাদের মাঝে হালকা উত্তেজনা তৈরি হয়ে গেল। এই উত্তেজনা লোক বিশেষে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। যেমন সাজ্জাদ যেকোন ট্যুরের আগে অনেক জামা-কাপড় কিনে। এমনও হয়েছে যে, কিছু ট্যুরের আগে ৩-৪ হাজার টাকার কাপড় কেনার পর দেখা গেল ওই ট্যুরই আর হচ্ছে না। তবে এবার এমন হয়নি, ট্যুর হয়েছে। এর পাশাপাশি একেকজনের একেক রকমের পরিকল্পনা ছিল র‍্যাগ ট্যুর নিয়ে। তার বাস্তবায়ন শুরু হলো। এর মাঝে একটা হলো ব্যাচের নাম ঠিক করা। অনেকেই অনেক নাম দিচ্ছিলো। এর মাঝে সিফাত (রোলঃ ১৩) কয়েকদিন আগেই Bio-Optics কোর্সে শেখা নতুন একটি শব্দ “Evanescent”-কে ব্যাচের নাম হিসাবে প্রস্তাব করলো। যদি গুগলে শব্দটির সংজ্ঞা খুঁজে দেখেন তাহলে পাবেন, ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া।আমাদের অবস্থাও তখন এমনই ছিল, মানে আমরাও আমাদের ভার্সিটির শেষের দিকে চলে এসেছি। ধীরে ধীরে সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই নামটা আমাদের সবার বেশ পছন্দ হয়ে যায়। এই শব্দের সাথে আমরা “18” শব্দটি যুক্ত করে নাম রাখি, “Evanescent 18”। এই শব্দের সংজ্ঞা থেকে আমরা আমাদের ব্যাচের ট্যাগ লাইনটিও পেয়ে যাই। সেটি হলো, “Beyond the barrier, fading away slowly”। নাম ঠিক হয়ে যাওয়ার পর, ব্যাচের লোগো বানানোর দায়িত্ব পড়লো পিয়াসের উপর। পিয়াস (রোলঃ ১৯) একটা লোগো দাড়া করালো। ওইটাই বিভিন্ন যায়গায় আমরা ব্যবহার শুরু করে দিলাম।

আমাদের লোগো উপরের ওই লিখা টুকু

লোগো এবং বাকি সব কিছু মোটামুটি হয়ে যাওয়ার পর, আমাদের পরের কাজ হয় র‍্যাগ ট্যুরের টি-শার্ট বানানোর কাজে হাত দেওয়া। সেটাও খুব সহজেই হয়ে যায়। যেহেতু লোগো আছেই, ঐটাই টি-শার্টে বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আমরা ভাবলাম একটা চাবির রিং এবং একটা কলম দিব যারা ট্যুরে যাচ্ছে। এই সব গুলো জিনিসকে এক-সাথে একটা বাক্সে করে দেওয়ার একটা প্ল্যান আমরা হাতে নেই। কেউ গিয়ে সব বক্স কিনে আনে, আমরা হলের সবাই মিলে রওনা দেওয়ার একদিন আগে সারা রাত ধরে বক্স গুলোকে প্যাকিং করে ফেলি। সেখানে সব কিছুর সাথে আরেকটা জিনিস যুক্ত করি আমরা। সেটি হলো আমাদের ট্যুরের জন্য কাস্টমাইজড পাসপোর্ট। এটাও আমরা নিজেরাই বানাই। আমি একটা ডেমো ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে আমাদের রুমের প্রিন্টার দিয়ে প্রিন্ট করে ফেলি। তবে এর জন্য আলাদা কাগজ ব্যবহার করি আমরা। জিনিস গুলো এই রাতের মধ্যেই করতে হত, কারণ পরের দিন ক্লাসের পরেই সবাই যে-যার মত ঢাকার দিকে রওনা হবে।

কাজ শেষ হওয়ার পর
এটাই সেই পাসপোর্ট

কাজ শেষ করে পরের দিন সকালে বক্স গুলো নিয়ে ক্লাসে গেলাম। যারা যাবে ওদের সবার বক্স দেওয়ার পর, আমরা আমদের সাথে যে যে স্যার যাবে তাদের হাতে বক্স তুলে দিলাম। এরপর হালকা ফটোশুট করে চলে এলাম রুমে। কারণ একটু পরই সব গুছিয়ে ঢাকা ছুটতে হবে।

ট্যুরের টি-শার্ট ও অমিত স্যার

খুলনা থেকে ঢাকার যাতায়াতটা আমারা নিজেদের মত করেছি। যে যার মত চলে গিয়েছে ঢাকা। আমাদের হলের মোটামুটি সবাই ক্লাস করেই চলে যেতে থাকে ঢাকার দিকে। এদের মাঝে আমি, আজমাইন, স্বপন, মেফতা আর সাজ্জাদ থেকে যাই। আমরা রওনা হই পরের দিন সকালে। সবাই যে যার মত পরিচিত কারো বাসায় উঠলেও, আমরা উঠি একটা স্বপনের ফ্রেন্ডের হোটেলে। এভাবেই আমাদের র‍্যাগ ট্যুর খুলনা থেকে ঢাকায় পৌছায়।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর

আমরা ঢাকা পৌঁছাই ৬ অক্টোবর সকালে। সেদিন ছিল বৃহঃস্পতিবার। সকালে পৌছানোর পর, আমরা হোটেলে ব্যাগ পত্র রেখে, ফ্রেশ হয়ে ছুটে চলি BCSIR-এ । ঢাকার সাইন্স ল্যাব বলতে যা বুঝায় এটাই ওটা। এখানেই আমাদের বিকাল পর্যন্ত ট্যুর। BCSIR বা Bangladesh Council of Scientific and Industrial Research হলো বাংলাদেশের সব থেকে ভালো একটি রিসার্চ সেন্টার। বাইরে থেকে তেমন বড় না লাগলেও ভেতরে বেশ বড় যায়গা নিয়ে এই স্থাপনাটি অবস্থিত। পাশাপাশি, বাইরে প্রচুর শব্দ থাকলেও, ভেতরটা বেশ নিরব ও ঠান্ডা। এখানে প্রতিটা বিল্ডিং এর-ই আলাদা আলাদা কাজ রয়েছে। মানে একেকটা বিল্ডিং-এ একেকটি স্পেশালাইজড কাজ করে। আমরা প্রথম যে বিল্ডিং-টায় গেলাম, সেখানে অনেক কিছু দেখলাম। তার মাঝে একটা সুন্দর জিনিস জানলাম যে, দেশে কোন খাদ্যে হারাম উপাদান আছে নাকি, তার পরীক্ষাও এই বিল্ডিং-এ হয়ে থাকে। এরপর রিসার্চ করার জন্য গিনিপিগ কিভাবে চাষ করে, তাও দেখলাম। এভাবেই প্রায় পুরাটা দিন আমাদের এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং-এ ঘুরতে হয়েছে। আমার নিজের এইসব জিনিসে খুব একটা আগ্রহ না থাকায়, বেশি কিছু মনে নাই।

তবে আমি BCSIR-এর কর্মকর্তাদের ব্যবহারে বেশ মুগ্ধ হয়েছি। সরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এতটা মাই-ডিয়ার টাইপের লোক হবে এটা BCSIR না গেলে বুঝতে পারতাম না। এরা কতটা ভালো তার একটা উদাহারণ দিলে বুঝতে পারবেন। আমাদের সবাইকে BCSIR এর পক্ষ থেকে প্রেজেন্টেশন দেওয়া হয়, তাদের সাম্প্রতিক গবেষণা নিয়ে। এরপর আমরা তাদের কিছু ল্যাব দেখে আরেক বিল্ডিং-এ যাব। সেখানে তারা আমাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এর মাঝে শুরু হয়ে যায় বৃষ্টি। এটা দেখে তারা কিছুক্ষণের মাঝেই গাড়ি এনে, এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিং-এ একে-একে সবাইকে নিয়ে গেছে। যা ভাবলে এখনো খানিকটা অবাক লাগে আমার কাছে।

বিকালের দিকে আমরা যাই পপুলার হসপিটালে। সেখানে আমাদের দুইজন সিনিয়র ভাই চাকুরি করত। তাদের মাধ্যমেই পপুলারের হসপিটালের অটোমেশন সিস্টেম আমরা ঘুরে ঘুরে দেখি। সব দেখা শেষ হলে, আমরা একে একে চলে যাই নিজেদের থাকার যায়গায়। ও আরেকটি কথা বলতে মনে নেই, আজকে সারাদিন আমাদের সাথে ছিল অমিত স্যার। এই লোকটা পুরাটা দিন আমাদের সাথে ছুটেছে।

বাড়ি ফেরার সময় দেখি ভালই বৃষ্টি পড়ছে। আমরা যারা হোটেলে উঠেছি, তারা কিভাবে যাব এই নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর, ভাবলাম উবারে করে যাই। দেখি একটা গাড়িও যেতে রাজি না। পরে একটা বাসে উঠে রওনা দিলাম। এরপর সাজ্জাদের কথা মত বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। সাজ্জাদ নামার সাথে সাথে ম্যাপ দেখে বলল, আর মাত্র ৫ মিনিট হাটলেই হোটেলে পৌঁছে যাব। আমরা কেউই ঢাকা তেমন চিনতাম না দেখে ওর কথা অনুযায়ী হাটা শুরু করি। কিন্তু ওর ৫ মিনিট যে ৩০ মিনিট হবে তা অনেক পরে বুঝতে পারি। এই বৃষ্টির মাঝে প্রায় ৩০ মিনিট হেটে আমরা হোটেলে পৌছাই। পুরা শরীর ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল সবার। তারপর গোসল দিয়ে, খেয়ে একটা ঘুম দেই।

র‍্যাগ ট্যুরের শুরু

সকালে ঘুম ভাঙলো ভালই দেরিতে। উঠে দেখি তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা হোটেলে দুইটি রুম নিয়েছিলাম। এক রুমে আমি আর আজমাইন। আরেক রুমে সাজ্জাদ, মেফতা আর স্বপন। ঘুম থেকে উঠে দেখি কালকে রাতের ভেজা কাপড় সব শুকিয়ে গেছে। এটা একটা ভালো দিক। নাহলে এই ভেজা কাপড় নিয়ে একটা ভালো বিপদে পড়তে হতো সবাইকে। ফ্রেশ হয়ে সবাই গেলাম খাওয়া দাওয়া করতে। হোটেলের কাছেই একটা যায়গায় সবাই খাওয়া দাওয়া করলাম। এরপর আজমাইন চলে গেল ওর খালার বাসায়। রয়ে গেলাম আমরা ৪ জন। এরপর সারাদিন মোটামুটি বসেই কাটালাম আমরা সবাই। আমাদের বাস ছাড়বে রাত ১০ টার দিকে। এর আগে জানিয়ে রাখা ভালো আমাদের ট্যুরে ৪ টি যায়গায় যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম।

  • সাজেক

  • রাঙামাটি (মূলত কাপ্তাই)

  • কক্সবাজার

  • সেন্টমার্টিন

সারাদিন শুয়ে বসে থেকে, সন্ধ্যা থেকে আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকি। সব কিছু গুছিয়ে রওনা দেই বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে। বাস যেখান থেকে ছাড়বে, সেটা আমাদের হোটেলের বেশ কাছেই ছিল। তাই হেটেই চলে গেলাম আমরা ৪ জন। গিয়ে দেখি মোটামুটি সবাই চলে এসেছে। আর যারা আসেনি তখনো, তারাও কিছুক্ষণের মাঝেই চলে এলো। বাসে উঠার সময়ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এর মাঝেও আমরা সবাই আমাদের ব্যাগ বাসে রেখে উঠে পড়লাম সবাইকে নিয়ে। আমাদের সাথে তখন ছিল, রাফি (রোলঃ ২), আজমাইন (রোলঃ ৬), ফাহিম (রোলঃ ৮), বসাক (রোলঃ ১০), দূর্বা (রোলঃ ১১), মাধব (রোলঃ ১২), সিফাত (রোলঃ ১৩), সাজ্জাদ (রোলঃ ১৪), তৃষা (রোলঃ ১৮), পিয়াস (রোলঃ ১৯), মেফতা (রোলঃ ২০), আরিয়ান (রোলঃ ২১), রাশেদ (রোলঃ ২২), তাসরিমা (রোলঃ ২৩), স্বপন (রোলঃ ২৭), রিফাত (রোলঃ ২৯) আর আমি। এর সাথে ছিল আমাদের দুইজন শিক্ষক, অমিত স্যার আর বশির স্যার। আর আমাদের সাথে অভিষেকের যাওয়ার কথা ছিল। তবে তীব্র জ্বরের কারণে শেষ মুহুর্তে সে আর যেতে পারেনি আমাদের সাথে। এই জ্বরের পেছনেও আমাদের ট্যুর থেকে বাদ দেওয়া স্যারের হালকা হাত ছিল। ট্যুরের আগের সপ্তাহে সে অভিষেককে টানা ৭ টা দিন খুলনা টু যশোর পাঠিয়েছে ল্যাবের কিছু কাজ করানোর জন্য। অভিষেক বার বার বলেছে, ট্যুর থেকে এসে সব করে দিবে। কিন্তু সেই স্যার শুনেনি। এই চাপ অভিষেকের শরীর নিতে পারেনি। অভিষেক এখনো মাঝে মাঝে এ নিয়ে আফসোস করে। সে যাই হোক, আমরা বাসে উঠার পর বাস চলতে শুরু করে সাজেকের উদ্দেশ্যে। মাঝে বাসটি যাত্রা বিরতি দেয় কুমিল্লাতে। আর কুমিল্লাতে মাধবের নানা বাড়ি হওয়ায়, ওর মামা অনেক গুলো মিষ্টি কিনে দেয় আমাদের সবার জন্য। মিষ্টি খেয়ে আবার বাসে চড়ে বসি।

সাজেক

সাজেক প্রশাসনিক ভাবে দেশের রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত। তবে সাজেকের সাথে খাগড়াছড়ির যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো। তাই আমাদের বাস ছুটে চলল খাগড়াছড়ির দিকে। আমরা সকালের দিকে খাগড়াছড়ি গিয়ে পৌছালাম। ছোট্ট একটি শহর। ঘুরে ফিরে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আমাদের যথা সময়ে আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। এরপর গেলে আর ঢুকতে দিবে না। তাই দ্রুত ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পর দুইটা জিপ নিয়ে রওনা হলাম সাজেকের উদ্দেশ্যে। আমরা যখন বান্দরবান ঘুরেছি, সেখানকার জিপ গুলোর ছাদ খোলা থাকত। তাই দাঁড়িয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু এখানকার জিপ গুলোর ছাদ খোলা নেই। তাই দাঁড়িয়ে যাওয়ার সুবিধাও নেই। আর যেহেতু দাঁড়িয়ে যাওয়া যায় না এইসব জিপে, যাদের motion sickness আছে, তাদের মাথা ঘোরানোর সম্ভাবনা খুবই বেশি। তাই চালাকি করে ড্রাইবারের পাশে সিটে গিয়ে সবার আগে বসে পড়লাম। সবার ব্যাগ ছাদে তুলে দিয়ে গাড়ি রওনা হলো। গাড়ি কিছুক্ষণ চলার পর একটা আর্মি ক্যাম্পে এসে থামলো। এখানে দেখলাম সব গাড়িই এসে অপেক্ষা করছে। এখানে সব গাড়ি সকাল ৯ টা বা ১০ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। এরপর দুইটি আর্মির গাড়ি পুরো বহরের সামনে ও পেছনে পাহাড়া দিতে দিতে নিয়ে যায়। এটা বহর মিস করলে, ওইদিন আর ঢুকতে দেয় না। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই অপেক্ষার মাঝেই, অনেকেই পাশের বাজার থেকে ফল কিনে খাচ্ছিল। আমার বন্ধু পিয়াসের বাজার ঘুরার খুব শখ আছে। ওই পুরা বাজারটা একটা চক্কর দিয়ে এলো। এর কিছুক্ষণ পরেই গাড়ির বহর চলতে আরম্ভ করল।

আমরা যে সময়টায় সাজেক যাচ্ছি, এটা আসলে সাজেকের অফ সিজন। তাই ফেসবুকে সাজেকের যে ভিড় দেখা যায় আমরা সেরকম একটা ভিড় দেখিনি। পাহাড়ে দিনের বেলা এমনেই বেশ গরম থাকে, আর আমরা যাচ্ছি অক্টোবর মাসে, তাই প্রচুর গরম লাগছিল গাড়িতে। এর উপর রাস্তাটা ছিল ভাঙা। যার ফলে পাহাড়ি রাস্তার মজাটা পাচ্ছিলাম না। গরমের পাশাপাশি ছিল প্রচুর ধূলা। দুই মিলে ভালই প্যারাদায়ক একটা ভ্রমণ ছিল খাগড়াছড়ি → সাজেক। আমরা দুপুরের দিকে সাজেক পৌঁছাই। সাজেককে ভ্যালি বললেও, আমার কাছে সাজেককে মনে হয়েছে, একটা পাহাড়ের দুই-পাশে কয়েকটা বাড়ি। মানে পাহাড়টা হালকা প্রশস্ত, এই টুকু। তবে সাজেক সুন্দর। রাস্তা থেকে যেকোন দিকে তাকালেই অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল।

গাড়ি থেকে নামার সময়, আমি একটা আছাড় খেলাম। একদম উল্টে পড়ে গেলাম। এরপর ডান-বামে না তাকিয়ে, উঠে নিজের ব্যাগ নিয়ে দ্রুত চলে গেলাম হোটেলে। সাজেকের বাকি হোটেল গুলোর মত, আমাদের হোটেলটাও মাচার উপর বানানো। পুরোটাই কাঠ দিয়ে বানানো। ৩ তলা হোটেলের ২য় তলায় ৪ টা রুম আর নিচ তলার ১টা রুম নেওয়া ছিল আমাদের। আমরা যে রুমটায় উঠলাম সেখানে দুইটা বেডে ৪ জন থাকা যায়। রুমের পাশেই একটা বারান্দা। সে বারান্দা থেকে সুন্দর পাহাড় দেখা যায়। তবে পুরা রাস্তার তীব্র গরমে এতক্ষণ থেকে এসব সুন্দর পাহাড় দেখার মন ছিল না। তাই দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম। পাহাড়ের উপরে হলেও, এখানে পানির ব্যবস্থা দেখলাম বেশ ভালো আর পানিটাও কোন কারণে বেশ ঠান্ডা ছিল। অনেক আরামের একটা গোসল দিলাম। গোসল দিয়েই বাকি সবাইকে নিয়ে দ্রুত খাওয়া দাওয়া করতে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে ঘুম দিলাম। বিকালে সবাই একটা পাহাড়ে ঘুরতে গেল। আমি জীবনে অনেক পাহাড় দেখেছি, এই ভং ধরে গেলাম না। পুরো বিকালটা ধরে ঘুমালাম। ঘুম থেকে উঠার একটু পর বাকি সবাই ফিরে এলো। এদের সাথেই কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। আসলে এখন আড্ডা দেওয়ার কিছু নাই। ট্যুরে কে কি ফানি কাজ করতেছে, এইসব নিয়েই হাসি তামাশা চলতেছিল। তারপর সবার সাথে আবার খাওয়া দাওয়া করতে গেলাম। আজকে রাতে আবার বাঁশের ভেতর রান্না করা বিরিয়ানির ব্যবস্থা করেছে সাজ্জাদ। ঐটা খেতে গেলাম সবার সাথে। খেয়ে বিশেষ কিছু মনে না হলেও, দোকানদারকে বললাম বেশ ভালো হয়েছে। এই সেই বলে, নিজের গ্রুপ নিয়ে বের হলাম সাজেক ঘুরতে। অনেকে ভাবতে পারেন রাতে দেখার কি আছে, আসলে ঘুরতে যাচ্ছি বলাটা ভুল হবে, আসলে আড্ডা মারতে যাচ্ছি। হোটেলে বেশি জোরে চিল্লানো যাবে না, তাই বাইরে থাকা।

হোটেল থেকে বের হওয়ার আগেই একটা কালো চাঁদর গায়ে নিয়েছিলাম। পাহাড়ে দিনে যত গরমই থাক, রাতে ভালোই ঠান্ডা পড়ে। তাই এই সাবধানতা। খাওয়া-দাওয়া করে, আমরা হাঁটতে লাগলাম হেলিপ্যাডের দিকে। ওইখানে বসবো এটাই প্ল্যান। এই রাস্তা হাঁটার পুরো সময়ের মাঝে যা দেখলাম, তার মাঝে প্রায় সবই ছিল দোকান, হোটেল না হয় খাবার হোটেল। এ ছাড়া একটা ভগ্ন গির্জা ছিল। আরেকটা সুন্দর মসজিদ। সেটা সাজেকের একবারে শেষের দিকে ছিল। আর মসজিদের সামনে ছিল লুসাই পাড়া। রাতে এটা বন্ধ ছিল। কাল সকালে এখানে যাব। খুঁজে খুঁজে হেলিপ্যাডে গেলাম। সেখানে বেশ ঠান্ডা বাতাস চলছিল তখন। এর মাঝে শুরু হলো আড্ডা। সে আড্ডার কোন নির্দিষ্ট দিক ছিল না। একেক সময় একেক দিকে যাচ্ছিল। এই-সেই করতে করতে অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পর রুমের দিকে ফিরতে শুরু করলাম।

রাতের সাজেক (ছবিতেঃ স্বপন)

ফেরার পথে একটা দোকানে চা খেলাম। ফিরে ঘুম দিব এই চিন্তা করলেও ঘুমাতে পারলাম না। কয়েকজন অমিত স্যারকে নিয়ে এলো কার্ড খেলার জন্য। এই লোকটার ভিতরের “না” বলার সুইচটা কোন কারণে বন্ধ মনে হয়, ঘুমে পড়ে যাচ্ছিল তাও খেলছিল সবার সাথে। এদের খেলার মাঝে ঘুমালে খারাপ দেখা যায় দেখে, আমারও জেগে থাকতে হচ্ছিল। খেলা শেষ হতে হতে রাত প্রায় ৪ টা বেজে যায়। আমার ঘুমও তখন উড়ে হয়ে গেছে। এর কিছুক্ষণ পরে যখন ঘুম আসা শুরু করছে তখন দেখি সবাই ডাকছে সকাল দেখার জন্য। পাহাড়ের সকাল বরাবরই সুন্দর। আগেও যেহেতু অনেকবার দেখেছি, সেই লজিকে এইবারও ঘুমানোর চিন্তা করলাম। কিন্তু ঘুমানোর আগে বারান্দাতে গেলাম পরিস্থিতি বুঝার জন্য (ঘুম/সকাল এর মাঝে লাভ-লসের হিসাব)। গিয়ে বুঝলাম ঘুমের থেকে এই সকাল দেখাটা দরকার বেশি। আমার পাশে মেফতা ছিল ঘুমাচ্ছিল, ওরে বললাম না দেখলে মিস করবি অনেক। এরপর দুইজন উঠে ছাদে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি পুরো ছাদটা ভিজে গেছে। আর দূরে মেঘ দেখা যাচ্ছে। আমরা যখন গেছি তখন সুর্য প্রায় উঠে গিয়েছে। যার ফলে সূর্যোদয় টা দেখা হয়নি। তারপরও সেখানে দাঁড়িয়ে অনেক ছবি তুলে ফিরে গেলাম রুমে। এখন একটু ঘুমাতে হবে।

সাজেকের সকাল

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম নাস্তা করতে। নাস্তার পর এক-এক করে চলে গেলাম সাজেকের লুসাই পাড়া। গিয়ে দেখি তখনো খুলেনি। তাই সামনের মসজিদের পাশে গিয়ে নিচের দৃশ্য দেখতে থাকলাম সবাই মিলে। এখানে সাজ্জাদ বলল, রাশেদের নাকি প্যান্ট ছিড়ে গেছে। পরে রাশেদকে ওর গায়ের চাঁদর দিয়ে মুড়ানো হলো। এর ফাঁকে কিছু ছবি তোলা হলো। এরপর আবার ফিরে গেলাম লুসাই পাড়া দেখতে।

মসজিদের পাশে সবাই
শক্ত করে বাঁধতে হবে (প্যান্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পর)

সাজেকের লুসাই পাড়ায় ঢুকতে টিকিট কাটা লাগে। এখানে আবার পাহাড়ের স্থানীয়দের জামা ভাড়া নেওয়া যায়, ছবি তোলার জন্য। আমাদের কয়েকজন মেয়ে, ভাড়া নিয়ে পড়েছিল সেই জামা। আমরা টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে গেলাম। ঢুকে যা বুঝলাম এটা পার্কের মত একটা যায়গা। কিছু বসার যায়গা, দোলনা আর একটা দোকান। দোকানটা Self Service টাইপের। মানে নিজে টাকা দিয়ে, নিজেই জিনিস নিবে এমন। দোকানে বেশি কিছু নাই। ফলমূলই বেশি। ভিতরে মুক্ত মঞ্চের মত একটা যায়গা আছে। সেখানে আমরা সবাই মিলে একটা ডামি ক্লাস করলাম অমিত স্যারকে নিয়ে। এই সব কিছুর মাঝেই একটা ঘটনা, ঘটিয়ে ফেলল আমার বন্ধু মেফতা। সে অনেক আবেগ নিয়ে, দোলনায় বসে ভিডিও করার প্ল্যান করছিল। কেবলই ভিডিও করা শুরু হয়েছে, সাথে সাথে মেফতা উল্টো হয়ে পড়ে গেল দোলনা থেকে। মেফতার সেই ভিডিও আর করা না হলেও, তার আছাড় খাওয়ার ভিডিওটা সুন্দর করে হয়ে গেল। এরপর ধীরে ধীরে আমরা হোটেলে ফিরতে শুরু করলাম। একটু পরেই আমাদের গাড়ি চলে আসবে।

সাজেক ক্যাম্পাসে ক্লাস চলছে

রুমে ফিরে, সব গুছিয়ে গাড়ির অপেক্ষা করছিলাম। এর মাঝে গাড়ি চলে এলো। তার আগে আমরা ছাদে গিয়ে গ্রুপ ছবি তুলে ফেললাম কয়েকটা। তারপর গাড়িতে উঠে খাগড়াছড়ির দিকে রওনা হলাম।

খাগড়াছড়ি → রাঙামাটি

আমরা দুপুরের দিকে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি পৌঁছাই। সেখানে খাওয়া-দাওয়া করে বাসে উঠে রওণা হই রাঙামাটির দিকে। কালকে রাতে না ঘুমানোর কারণে বাসে উঠেই গভীর একটা ঘুম দিলাম। শেষ বিকালের রোদ বাসের জানালা ভেদ করে গায়ে লাগলেও, ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে পরলাম। এরপর ঘুম ভাঙে সন্ধ্যার দিকে। তখন আমরা প্রায় রাঙামাটির কাছাকাছি চলে এসেছি। শহরে ঢুকার আগেই বাসের ড্রাইভার ভুল রাস্তায় চলে গেল। এই ভুল ভাঙতে তার সময় লাগে ৩০ মিনিটের মত। এতে করে বাস ঢুকে যায় পাহাড়ের ভেতর। তখন আর বাস ঘুরানোর যায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। বাস বাধ্য হয়ে সামনে আগাতে থাকে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল দেখে, আমরাও হালকা ভয় পাচ্ছিলাম। ভয় পাওয়ার খানিকটা কারণও ছিল। আগের দিন এই দিকেই একটা যায়গায় বাস ডাকাতি হয়েছে। সেই ভয় নিয়ে সামনে আগাতে থাকে বাস, একটা যায়গা পেলাম যেখানে বাস ঘুরানোর মত খানিকটা জায়গা আছে। সেখানে বাস ঘুরিয়ে ফিরে এলাম আবার পূর্বের যায়গায়, যেখানে রাস্তা ভুল হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে আবার রাঙামাটির দিকে বাস চলতে শুরু করল। আমরা খুব সম্ভবত রাত ৮/৯ টার দিকে হোটেলে পৌছালাম। নেমে যে জিনিসটা বুঝলাম, রাঙামাটি শহরে বেশ গরম। এসি ছাড়া থাকাই যাচ্ছে না। আর হোটেলের রুম গুলো ছোট হওয়াতে আরও যেন গরম বেশি লাগছিল। সবাই রুম নিজেদের মত ভাগ করে নিয়ে, দ্রুত গোসল দিয়ে নিলাম। সারাদিনে গায়ে প্রচুর ধূলা লাগার কারণে গরম যেন আরও বেশি লাগছিল। গোসল করে হালকা ভালো লাগছিল। এরপর বের হলার শহরে হাঁটতে। রাঙামাটি শহরটি বান্দরবান আর খাগড়াছড়ির থেকে বড় লেগেছে আমার কাছে। তবে এই শহরের চারিদিকে শুধু পানি মনে হয়। এর কারণ কাপ্তাই লেক। এই লেক যেন শহরটিকে জালের মত ধরে রেখেছে। রাতে খুব ভালো বুঝা না গেলেও, দিনের বেলা খুব ভালো করে বুঝা যায়। খানিকটা ঘুরে এসে, একটা হোটেলে রাতের খাবার খেলাম। এরপর অমিত স্যার এর পাশাপাশি আরও কয়েকজন আমাদের সাথে যুক্ত হলো, এদের সাথে শহরের আরও ভেতরে কিছুক্ষণ হাটলাম। আমরা যখন হাটছিলাম তখন পুরো শহরে ঘুমিয়ে গেছে। যার ফলে যানবাহন ছিলই না। পুরো রাস্তা ছিল ফাঁকা। এভাবে উদ্দেশ্যহীন ভাবে কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে গেলাম রুমে। রুমে গিয়ে কালকে সকালের প্রস্তুতি হিসাবে ঘুমিয়ে পরলাম।

কাপ্তাই

ঘুম থেকে ভালই সকালে উঠলাম। উঠে দেখি সবাই ঘুমাচ্ছে। আমিও তাই শুয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। এরপর ফ্রেশ হয়ে দেখি সবাই মোটামুটি উঠে গিয়েছে। এরপর সবার ফ্রেশ হওয়া শেষ হলে, কাছেই একটা খাবার হোটেলে গিয়ে সকালের নাস্তা করলাম সবাই মিলে। সবার খাওয়া শেষ, আমরা সবাই মিলে কিছুদুর হেটে গেলাম নৌকায় উঠতে। এই নৌকায় করেই পুরো কাপ্তাই ঘুরব আমরা। তীব্র রোদ থাকায় আমরা অনেকেই ছাতা নিয়েছিলাম আজ। আর আমরা কয়েকজন কি মনে করে গোসল করার সব কিছুই নিয়েছিলাম। তখনও জানতাম না কাপ্তাই-এ গোসল করতে পারব। কিন্তু পরে গিয়ে গোসল করার সুন্দর একটা যায়গা পেয়েছিলাম।

নৌকায় উঠার প্রস্তুতি (কাপ্তাই)

কাপ্তাই-এ যে নৌকা গুলো চলে, তা অনেকটা ইঞ্জিন লাগানো বড় নৌকা গুলার মতই, শুধু উপরে ছাদ দেওয়া। আর দেশের অন্যান্য ইঞ্জিন-ওয়ালা নৌকার মতই এই নৌকাও তীব্র শব্দে চলাচল করে। এই তীব্র শব্দ সাথে করে নিয়ে কাপ্তাই ভ্রমনে বের হয়ে পড়লাম সবাই। আমরা কেউ সাঁতার না জানলেও, সবাই ছাদেই বসে ছিলাম। কাজটা অনেক বিপদজনক হলেও, কেউ পাত্তা দেয়নি। ছাদে বসে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা গেলেও, এখানে কিছু সমস্যা ছিল। প্রথমত তীব্র গরম, দুই হচ্ছে বেশিক্ষণ হেলান দেওয়া ছাড়া ছাদে বসে থাকতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তীব্র রোদের কারণে ছাতা নিলেও, তেমন কাজে আসছিল না। কারণ রোদে ছাদ গরম হয়ে যাচ্ছিল। তাই মনে হয়েছে, এখানে মোটামুটি ঠান্ডা আবওহাওয়ার সময় আসতে হবে। এরপরও খারাপ যাচ্ছিল না। নানারকম খোশ গল্প চলছিল নিজেদের মাঝে। কিছুক্ষণ নৌকা চলার পর শুনলাম, রাঙামাটির বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রিজটা পানিতে ডুবে আছে। তাই ওখানে গিয়ে লাভ নেই। আমরা দূর থেকে ঐ ব্রিজটা দেখেছিলাম। শুধু মাথা দেখা যাচ্ছিল ব্রিজের।

ঢুবে গেছে ঝুলন্ত ব্রিজ

তবে এখানে ঘুরার একটা আলাদা মজা আছে। নৌকাটা পাহাড়ের মাঝ দিয়ে যাচ্ছিল। নৌকা থেকে সুন্দর পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। কিছু অন্য নৌকাও ছিল, তবে তা কম। এভাবে কিছুক্ষণ ঘুরার পর আমরা বাংলাদেশ পুলিশের নিয়ন্ত্রিত একটা স্পটে গিয়ে নামলাম। এটা অনেকটা রিসোর্টের মত। সাথে পিকনিক করার মজা যায়গা আছে। এখানে প্যারিসের সেইন নদীর তীরের লাভ লক ব্রীজের (Love lock bridge) মত তালা ঝুলানোর ব্যবস্থা আছে। আমরাও “Evanescent 18” একটা তালায় লিখে সেখানে ঝুলিয়ে দিলাম। এখানে আরেকটি মজার জিনিস আছে। তা হলো কায়াকিং করা যায়। জীবনের প্রথম কায়াকিং এর অভিজ্ঞতার জন্য একেবারে উন্মুখ ছিলাম। দ্রুত আমি, রিফাত আর আজমাইন একটা নৌকায় উঠে গেলাম। উঠেই বুঝলাম এই জিনিসটাকে কনট্রোল করা অনেক ঝামেলার। সাথে তিনজন হওয়াতে সমন্বয় রাখা আরও কঠিন। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর, খানিকটা নিয়ন্ত্রনে এলেও খুব একটা কাজ হয়নি। পুরাটাই আল্লাহর নামে চলেছে। কায়াকিং টা মজার হলেও রোদটা বেশ ভুগাচ্ছিল। কায়াকিং শেষে এখানেও ছোট্ট একটা ঝুলন্ত ব্রিজ আছে, এখানে কিছু ছবি তোলা হলো অনেকের। এরপর খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে, চললাম পরবর্তি গন্তব্যে।

Love Lock করার যায়গা (ছবিতেঃ মেফতা ও ফাহিম)
সবার সাথে কায়াকিং

এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি তা নিজেও জানি না। কিছুক্ষণ ছাদে থাকছি, আর রোদ বেশি লাগলে নিচে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। আবার একটু পর ছাদে। এইভাবেই চলছিল। আর নৌকা পাহাড়ের ভেতরের জলের রাশির মাঝে ভট ভট করে ছুটে চলছিল। এর মাঝে আকাশটা হালকা কালো হয়ে এসেছিল। তবে তা বৃষ্টির দিকে যায়নি। বরং রোদ তার নিজের ক্ষমতা যেন খানিকটা প্রকট করে ফিরে এসেছে।

কাপ্তাই-এর সাথে মিতালি (ছবিতেঃ আরিয়ান)

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর, আমরা একটি ঝরণার কাছে গিয়ে থামি। ঝরণার নামটা এখন আর মনে নেই। এখানে দেখি একটা স্থানীয় দল পিকনিকে এসেছে। আমাদের নৌকা ওদের পাশে দাঁড়ানোর সাথে-সাথেই ওদের নৌকা থেকে একজন লাফ দিয়ে আমাদের ছাদে চলে এলো। এসেই পিয়াসকে লাল রঙ-এর একটা পানীয় খাওয়ার ইশারা করল। পিয়াস অতি দ্রুত না করে দিল!! বেশ কিছুক্ষণ রোদে থাকার দরুণ সবাই এই ঠান্ডা যায়গায় এসে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এরপর আমাদের মাঝে একটা দোটানা শুরু হলো। গোসল করবে নাকি করবে না। আসলে গোসল সবাই করবে, খালি প্রথমে কে নামবে তার জন্য অপেক্ষা। এর মাঝে কেউ একজন রাজি হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল, একে একে নামার পালা। এরপর দুই একজন ছেলে আর মেয়ে গুলো বাদে সবাই নেমে এই ঝরণায় গোসল করেছে। এই তীব্র গরমে এমন ঠান্ডা পানিতে গোসল করার মত শান্তি আসলে হতেই পারে না। বেশ খানিকটা সময় ধরে গোসল করার পর, আমরা নৌকায় উঠে এলাম। এসে সাথে করে আনা কাপড় গুলো পড়ে, ভেজা কাপড় ছাদে শুকাতে দিলাম।

অনেক শান্তির গোসল

এই ঝরনার পাশেই আনারস কেটে বিক্রি করছিল। বেশ কয়েকটা আনারস খেয়ে ফেললাম সবাই। আর এই ফাঁকে আমার অতি উৎসাহী বন্ধু রিফাত একাই দৌড়ে উঠে গেছে ঝরণার উপরে কি আছে দেখতে। হুট করে দেখি রিফাত নাই, একটু পর দেখি দ্রুত নেমে এসে বলতেছে, উপরে তেমন কিছু নাই। আমাদের কাপ্তাই ভ্রমণ এখানেই শেষ হয়, এরপর নৌকায় করে আমরা ফিরে যাই রাঙামাটি শহরে। সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের প্রায় বিকাল হয়ে যায়। নেমেই একটা যায়গায় দুপুরের খাবার খেয়ে, হোটেলে গিয়ে সব গুছিয়ে বাসে উঠে বসি। বাসে করে আমরা যাচ্ছি চট্টগ্রাম। সেখানে আমাদের বুফে বুকিং দেওয়া আছে। সেখানে আমরা শুধু এই বুফে খাওয়ার জন্য থামবো। এরপর সেখান থেকে চলে যাব কক্সবাজারের দিকে।

চট্টগ্রাম

র‍্যাগ ট্যুরের জন্য আমাদের সবাইকে ভার্সিটি থেকে ১৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়। যদিও আমাদের খরচ ১০ হাজারের উপরে, তাও যা দেওয়া হয় তাই নিয়েই খুশি। আমরা যখন জানতে পারলাম আমরা সবাই এই টাকাটা পাব, এটা দিয়ে কি করা যায় তাই নিয়ে আমরা খানিকটা চিন্তা করেছিলাম। চিন্তা করার মাঝে হুট করে কেউ একজন বলল বুফে খাওয়া যায় নাকি। এরপর খুঁজতে শুরু করলাম পথের মাঝে কোথায় খাওয়া যায়। সে হিসাবে সব থেকে সুইট স্পট হিসাবে চিহ্নিত করলাম চট্টগ্রামকে। তাই আমরা খুলনা থাকতেই, চট্টগ্রামের একটা ভালো হোটেলে বুকিং দিয়ে রেখেছিলাম সবার। ওই খাওয়া-দাওয়া করার জন্যই আমরা রাঙামাটি থেকে কক্সবাজার যাওয়ার সময় আমরা চট্টগ্রাম ৩ ঘন্টার যাত্রা বিরতি দিই।

আমরা বুকিং দিয়েছিলাম চট্টগ্রামের Bonjour হোটেলে। বাস থেকে সরাসরি হোটেলের সামনে নেমেই চলে গেলাম হোটেলে। আমাদের বেশির ভাগ মানুষই তখন একবারও বুফে খাওয়া হয়নি। তাই সবার টার্গেট ছিল ম্যাক্সিমাম পারফর্মেন্স দেখানোর। এর জন্য ছেলেরা বেশির ভাগ ঢিলে-ঢালা হাফ প্যান্ট পরে বিশাল এই হোটেলে চলে গেলাম। এখন ভাবলেও হালকা অবাক লাগছে, সবাই কিভাবে হাফ প্যান্ট পড়ে চলে গিয়েছিলাম?? এরপর ভেতরে গিয়ে আমাদের জন্য রাখা টেবিলে বসে খাওয়া শুরু করলাম। তবে খাওয়া শুরু করে বুঝলাম এটা আসলে আমার জন্য না। মাংস এত বেশি খাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। তারপরও আমাদের বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাবার নিজের পেটে ভরতে সক্ষম হয়েছিল। এদের মাঝে পিয়াস, মেফতা আর সাজ্জাদের নাম না নিলেই নয়। আর দুইজন স্যারের মাঝে বিজয়ী ছিল বশির স্যার।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে, আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বাসে উঠে যাই। এরপর একবারে ঘুম ভাঙে কক্সবাজার গিয়ে।

পেট চুক্তি হয়েছে (চট্টগ্রাম)

কক্সবাজার

কক্সবাজার গিয়ে পৌঁছাই অনেক ভোরে। বাস আমাদের সরাসরি হোটেলের সামনে নামিয়ে দেয়। দ্রুত রুমে গিয়ে আবার হালকা একটা ঘুম দেই। ঘুম থেকে উঠে বাইরে বের হয়েই সমুদ্রের কাছে গরমের সময় আসার ভুল বুঝতে পারলাম। খুলনা থাকার কারণে এই গরম খুব একটা কঠিন না লাগলেও, একটা অস্বস্তি ভাব ছিলই। বের হয়েই নাস্তা করলাম। নাস্তা করে দেখলাম সবাই একে একে সাগরে গোসল করতে চলে গেল। রয়ে গেলাম আমি, পিয়াস আর মাধব। আমরা ৩ জন সাগরের কাছাকাছি যেতেই বেশ বিরক্ত ধরে গেল গরমে। আমি বললাম, আমি অনেক সাগর দেখছি (কুয়াকাটা+সুন্দরবন গেছি বেশ কয়েকবার)। এটা আজকে দেখতে পারব না। দরকার হয় রাতে আবার আসব। আমার এই কথা শোনার পর পিয়াস একটু দোটানার মাঝে পড়ে গেল। ওই আগে সাগরে যায় নাই, কিন্তু এই গরমে ওর শরীরের উপর ভালো চাপ দিচ্ছিল। লম্বা পিয়াস একটু মাথাটা উঁচু করে বলল, ওই যে সাগর দেখছি, আমিও তর সাথে চলে যাব। এই করে মাধবও আমাদের সাথে রুমে চলে এলো। রুমে এসে আমরা এসি ফুল ঠান্ডা মোডে দিয়ে বাংলাদেশের খেলা দেখা শুরু করলাম। ঘন্টা খানিক পর বাকি সবাই এসে লাইন ধরল ওয়াশরুমে গোসল করার জন্য। আমরা তখন লেপের নিচে বসে খেলা দেখছি। সবাই গোসল করা শেষ হলে, ওদের কাছে অনেক রোমাঞ্চকর কাহিনি শুনলাম সাগরের। সাগরের ভিতরে স্পিড বোট নিয়ে ঘুরে আসছে নাকি সবাই। সব থেকে পিনিকের কাহিনি শুনালো আমাদের ভিপি, সাজ্জাদ। একটা মেয়ের অভিবাভক হিসাবে স্পিড বোটে করে মাঝ সাগরে নিয়ে গিয়েছিল সাজ্জাদ। সে মেয়ের আবার রিসেন্টলি ব্রেকাপ হয়েছে। মাঝ সাগরে গিয়ে নাকি হাজার খানেক গালি ঝারছে সাজ্জাদের সামনে। সাজ্জাদের আবার সব শুনতে হয়েছে পিছনে বসে।

বিকালে আমরা রওনা দিলাম মেরিন ড্রাইভ ধরে। গাড়ি আগেই ঠিক করা ছিল। আমাদের হোটেলের সামনে থেকে এসে নিয়ে গেল। সেখানে চাঁদের গাড়িতে করে ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম। একটা যায়গায় দাঁড়ালাম। সবাই মিলে ছবি তুললাম এখানে। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায় আমাদের। এর মাঝেই সিফাত (কক্সবাজারের বাসিন্দা) বলে হিমছড়ি পাহাড়ে উঠা যায়। সাথে সাথেই সবাই রাজি হয়ে যাই। দ্রুত এই গোধূলির মাঝে উঠতে শুরু করি পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে। দ্রুতই উঠে যাই। সন্ধ্যার হালকা আলোতে পাহাড় থেকে সাগরটাকে ভালই লাগছিল। সেখানে নিজেরা কিছুটা সময় কথা বললাম। তবে এই পাহাড়ে সিঁড়ি থাকায় প্রচুর লোক ছিল। যার কারণে পুরো যায়গায়টাই ময়লার স্তুপে পরিণত হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে নামা শুরু করলাম। পাহাড়ে নামা বরাবরই কঠিন। তাই খানিকটা সময় বেশি লাগলো। নামতে নামতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। অন্ধকারের মাঝে আমরা ফিরে চললাম আমাদের হোটেলের দিকে। এই সময় গাড়ি থেকে সাগরের শব্দ শুনতে ভালই লাগছিল।

হোটেলে ফিরে, সবাই হালকা ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম “পউষী” হোটেলে। কক্সবাজারের অনেক বিখ্যাত একটি হোটেল। এখানে গড়পড়তা বাংলাদেশি খাবারের পাশাপাশি, সামুদ্রিক মাছের অনেক আইটেম পাওয়া যায়। আমরাও গেলাম এই কারণে। তবে আগের দিনের বুফে খাওয়ার পর সবার পেটের অবস্থাই খানিকটা খারাপ। আমি তাই বেশি খেতে পারিনি। খাওয়া শেষ হলে, আমরা গেলাম কাছেই একটা মার্কেটে। এটা আমাদের পরিচিত যেকোন মার্কেটের মতই। রাস্তার দুই পাশের বিল্ডিং গুলোতে দোকান। তবে এখানে মানুষ অনেক আসে মনে হয়। কারণ বেশির ভাগ বাড়ির বেসমেন্টেও দেখলাম দোকান বসানো আছে। এখানে বার্মিজ আঁচার থেকে শুরু করে নানা জাতের জিনিস মোটামুটি কম দামে পাওয়া যাচ্ছিল। আর সিফাতের স্থানীয় ভাষায় পারদর্শিতার কিছু সুবিধা পাচ্ছিলাম। অনেক ধরেণের আঁচার কেনা হলো। অনেকে আরও অনেক কিছুই কিনল এখান থেকে।

বাজার করে রুমে ফিরে এলাম। রুমে এসে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিলাম। কাল আবার যেতে হবে সেন্ট মার্টিন। তাই সব কিছু আগেই গুছিয়ে রাখলাম। সকালে বাস এসে নিয়ে যাবে টেকনাফ। সেখান থেকে বড় জাহাজে করে যেতে হবে সেন্ট মার্টিন।

কক্সবাজার → টেকনাফ → সেন্ট মার্টিন

সকাল বেলা বাস চলে এলো হোটেলের সামনে। ঘুম থেকে কোন রকমে উঠে বসে পড়লাম বাসে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চলে এলাম টেকনাফ। আমরা টেকনাফে নিজেদের ব্যাগের সাথে অনেক গুলো বড় পানির বোতলসহ এসেছি। সেন্টমার্টিনে খাবার পানির সংকট থাকায় অনেক দামে কিনে খেতে হয়। তাই কক্সবাজার থেকে কিনে যাওয়ার প্ল্যান করা হয়। টেকনাফে একটা ছোট হোটেলে সকালের নাস্তা করলাম। এরপর ধীরে ধীরে জাহাজের দিকে যেতে থাকলাম। এই যায়গাটা উখিয়ার অনেক কাছে থাকায়, জাহাজে উঠার রাস্তার পাশে ছোট ছোট রোহিঙ্গা শিশুদের রিলিফের খাবার বিক্রি করতে দেখলাম। এর কারণ দুইটি হতে পারে, হয় এদের শুধু খাবার দেওয়া হচ্ছে বাকি প্রয়োজনের কথা নিয়ে কেউ ভাবছে না অথবা খাবার পরিমাণ এত বেশি যে এরা বিক্রি করে দিচ্ছে। যাই হোক না কেন, এইভাবে শুধু রিলিফ দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব না।

জাহাজে উঠার সময় সমস্যা দেখা দিল সেই পানির বোতল গুলো নিয়ে। জাহাজের দায়িত্বরত লোক কোন ভাবেই প্লাস্টিকের এত গুলো বোতল নিয়ে আমাদের সেন্ট মার্টিন যেতেই দিবে না। অনেক বার বুঝিয়ে লোকটাকে রাজি করানোর পর, সে নিজেদের কাছে বোতল গুলো রাখতে রাজি হলো। কথা ছিল জাহাজ থেকে নামার সময় আমরা নিয়ে যাব। এরপর আমরা আমাদের সিটে গিয়ে বসলাম। আমাদের জাহাজটি ছিল ২ তলা। আমাদের সিট গুলো ছিল ২য় তলায়। সেখানে আমাদের ব্যাগ পত্র গুলো রেখে চলে গেলাম জাহাজের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়েই আড্ডা চলতে লাগলো। এর মাঝেই জাহাজ নাফ নদী ধরে চলতে লাগলো সেন্টমার্টিনের দিকে। তবে বেশিক্ষণ এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব ছিল না গরমের কারণে। তাই মাঝে মাঝে এসে সিটে বসছিলাম। এভাবে করেই দুপুর প্রায় ১-২ টার দিকে আমরা সেন্ট মার্টিন পৌঁছাই। সেন্টমার্টিন নেমেই যে জিনিসটা প্রথম চোখ আটকায় তা হলো সাগরের নীল জল। সাধারণত কুয়াকাটা বা অন্য কোথাও নীল জলের সাগর দেখা যায়। এটা প্রথম সেন্ট মার্টিন এসে নীল সাগর দেখলাম। জিনিসটা দেখতে বেশ ভালো লাগছিল।

সেন্টমার্টিন

জাহাজ থেকে নামার সময় সেই পানির বোতল গুলো নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। গিয়ে একটা ইজি বাইক ঠিক করে নিজেদের সব ব্যাগ পাঠিয়ে দিলাম হোটেলের দিকে। এরপর বাকি সবাই হাঁটতে শুরু করলাম। সবাই হেটে যাওয়ার কারণ মুলত অতিরিক্ত গাড়ি ভাড়া। সেন্টমার্টিনে জাহাজ থামার সাথে সাথে যে যায়গায় ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা হয়, সেই ভাড়া ৩০ মিনিট পর ৫০ টাকা হয়ে যায়। এই জন্যই বাকি সবাই হেটে যাচ্ছিলাম। আমরা যে পথটা ধরে হাটছিলাম তা RCC ঢালাই করা। রাস্তার দুই ছোট ছোট ঘর। মাঝে একটা দুর্যোগ কেন্দ্র দেখলাম। ঘূর্ণিঝড়ের সময় এখানে মানুষ আশ্রয় নেয়। প্রায় ১৫-২০ মিনিট হাঁটার পর আমরা হোটেলে পৌছালাম।

হোটেলে পৌঁছে যা দেখলাম তা আসলে হোটেল বললে ভুল হবে। এটা ছিল একটা ছোট্ট স্কুলের মত। দুই পাশে দুটি টিনের শেড দেওয়া ঘর। প্রতি রুমে দুইটি করে খাট। এবং বেশ অন্ধকার রুম গুলো। দিনের বেলাতেও লাইট জ্বলিয়ে রাখতে হয়। রুমে গিয়েই আমরা ৫-৬ জন আগে চলে গেলাম সাগরে। আগের দিন কক্সবাজার নামিনি, তাই এখানে সবার আগে নেমে পড়লাম। তবে এখানের সাগরে নামতে গেলে খানিকটা সাবধান থাকতে হয়। কারণ এখানের সাগরের তীরে প্রচুর পাথর। আর এই পাথর গুলো বেশ ধারালো। যার কারণে পা কেটে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা তাই খুঁজে খুঁজে এমন যায়গায় গেলাম যেখানে কিছু মানুষ আগে থেকেই গোসল করছে। সেখানে নেমে হালকা নীল জলকে ঘোলা করার কাজে নেমে পড়লাম। আমাদের পাশেই আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপ ছিল। অনেকে দেখলাম ফুটবল নিয়ে খেলছে সাগরে। এর মাঝে এক ভাইকে দেখলাম কিছু ডাইভিং সামগ্রী নিয়ে পানিতে ডুবে নিচে দেখার চেষ্টা করছে। জিনিসটা হুদাই করছে। কারণ সেখানে পানি ছিলই কোমড় সমান। খানিক পর আমাদের সাথে আরও কয়েকজন যোগ দিল। কিছুক্ষণ লম্ফজম্প করে উঠে গেলাম আমরা। গিয়ে গোসল দিয়ে বের হলাম দুপুরের খাওয়ার উদ্দেশ্যে।

দুপুরে খেতে গিয়ে দেখলাম এখানে খাবার দাম অত্যাধিক বেশি। তাই আমরা সব থেকে সস্তা বিকল্প খুঁজতে থাকলাম। পেয়েও গেলাম। সেই সস্তা বিকল্প ছিল প্যাকেজ টাইপ। ৮০ টাকার প্যাকেজ। এই প্যাকেজের মাঝে ছিল একটু আলু ভর্তা, ভাত আর ডাল। এখানে ভাত আর ডাল যত ইচ্ছা তত ছিল। কিন্তু এত দিন বাইরের খাবার খাওয়ার পর আসলে বেশি খাওয়ার মত রুচি ছিল না। কোন রকম খেয়ে রুমে ফিরে গেলাম।

এরপরের বিকাল টুকু প্রায় সবাই শুয়ে বসে কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যায় অমিত স্যারকে নিয়ে চলে গেলাম সাগরের তীরে। তার সাথে অনেক বিষয়ে কথা বললাম। এখানে আমরা প্রায় সবাই ছিলাম। একেকজন একেক বিষয় সামনে আনছিল, তাই নিয়ে চলছিল আলোচনা। এর মাঝে পিয়াস কিছু হাই এক্সপোজার ছবি তুলে ফেলল। রাতের তাঁরার সাথে এই ছবি গুলো বেশ সুন্দর হয়েছিল। এরপর হালকা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলে, আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম হোটেলের দিকে। ফিরে দেখি হোটেল পুরো অন্ধকারে। এর কারণ হচ্ছে সেন্টমার্টিনে কোন বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। এখানে সব কিছুই চলে জেনারেটর দিয়ে। আমরা ফেরার পর জেনারটর দিল। সে দিয়ে কিছু আলো জ্বলল। এরপর রাতের খাবার খেয়ে রুমের মাঝেই আড্ডা দিচ্ছিলাম আমরা কয়েকজন। পাশের রুমেই তখন চলছিল Uno খেলা। অনেকেই খেলছিল সাথে আমাদের দুই স্যারও জয়েন করল। সেন্টমার্টিন ছিল আমাদের শেষ ট্যুরের একবারে শেষ গন্তব্য। তাই কয়েকদিনের টানা বাস ভ্রমণের কারণে সবাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। সবাই দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে উঠেই দেখি গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমার রুমের পিয়াস আর আজমাইন তখনো উঠেনি। শুধু রিফাত উঠেছে। পাশের রুমে গিয়ে দেখি সিফাত আর রিফাত বসে আছে। ফ্রেশ হয়ে দেখি আরিয়ান আর পিয়াসও উঠে গিয়েছে। ওদের সাথে নিয়ে আমরা বের হয়ে পড়লাম সকালের নাস্তা করতে। আমাদের সঙ্গী হলো ছাতা। এই ছাতা গুলো আমরা বৃষ্টির জন্যই এনেছিলাম। কিন্তু সেন্টমার্টিনের আগে কোথাও বৃষ্টি হয়নি। হালকা বৃষ্টির মাঝে আমরা জাহাজ ঘাটের দিকে গেলাম। সেখানেই একটা হোটেলে সকালের নাস্তা করলাম পরোটা আর ডিম ভাজি দিয়ে। হোটেলের অবস্থা ছিল খুবই করুন। এত নোংরা যে সেখানে বসে খাওয়া বেশ কঠিন। তারপরও কিছু মুখে দিয়ে জাহাজ ঘাটে গিয়ে, দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি চলে গেছে। মেঘের ফাঁকে রোদ উকি দিচ্ছে। ছেঁড়া দ্বীপে কখন যাব তাই নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। কারণ আমাদের হোটেলের একজন বলছিল ভাটা শুরু হবে ৩ টার পর। কিন্তু এখানের বাজারে একজন আমাদের বলল, এখনই ভাটা চলছে। এই আলোচনার মাঝে হুট করে কথা উঠলো পুরো দ্বীপটা ঘুরতে যাওয়া যায় নাকি। এই সম্ভবনা আমরা শুরুতেই বাদ দিলাম না। কারণ কালকেই এক স্যার বলল, ২ ঘন্টা ধরে হাটলেই পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখা সম্ভব। জীবনের মাত্র ২ ঘন্টা ব্যয় করে এত সুন্দর দ্বীপ একটা ভ্রমণ করাই ত যায়, এই ধারণার উপর ভিত্তি করে হাটা শুরু করলাম। কিন্তু তখনো আমরা বুঝিনি প্রায় ৮ ঘন্টার মত লাগবে আমাদের।

হাঁটতে শুরু করার পর আমাদের বেশ ভালই লাগছিল। আকাশে তেমন রোদ নেই, সাথে সাগরের নির্মল বাতাস। হাঁটতে একটা জিনিস খেয়াল করলাম সেন্টমার্টিনের বেশির ভাগ হোটেল গুলোই প্রতিবছর মেরামত করতে হয়। জোয়ার-ভাটার কারণে বালি সরে যায়, এর ফলে বেশির ভাগ স্থাপনাই ভেঙ্গে যায়। তাই প্রতি বছর টুরিস্ট সিজনে এইগুলো আবার মেরমত করা হয়। আমরা যখন গিয়েছি, তখন টুরিস্ট সিজন কেবল শুরু হচ্ছে। তাই বেশির ভাগ টুরিস্টদের থাকার যায়গা গুলোই ভাঙ্গা অবস্থায় ছিল। কিছু কিছু মেরামত শুরু হয়েছে মাত্র। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে আমরা প্রথমে বসলাম কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্পের পাশেই। সেখান থেকে দূর কোস্ট গার্ডের দুইটি জাহাজ দেখা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। পথের মাঝে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হলাম যে এখন ছেঁড়া দ্বীপে ভাটা শুরু হয়েছে। তাই হোটেলে যারা আছে ওদের ফোন দিলাম যেন ছেঁড়া দ্বীপে এখনই চলে যায়। নাহলে ওরা যেসময় যাবে বলে প্ল্যান করেছে তখন গেলে আর ছেঁড়া দ্বীপ দেখা হবে না। এখন বলি ছেঁড়া দ্বীপের সাথে জোয়ার-ভাটার সংযোগটা কি। ছেঁড়া দ্বীপ জোয়ারের সময় সেন্ট মার্টিনের ভুল ভূ-খন্ড থেকে আলাদা হয়ে যায়। যার কারণে ওখানে যেতে হলে ভাটার সময় যেতে হয়।

হাঁটার ফাঁকে, এক সাথে সাগর বিলাশ করছি

আমরা যখন ছেঁড়া দ্বীপ পৌঁছাই তখন মধ্য দুপুর। আর তখন আর আকাশে মেঘ বলতে কিছু নেই। তীব্র রোদে পুড়ে যাচ্ছি সবাই। ছেঁড়া দ্বীপ যেখান থেকে শুরু হয়, সেখানে কিছু দোকান আছে। সেখানে ঝালমুড়ি, পানি খেয়ে আমরা দ্বীপের দিকে হাঁটতে শুরু করি। এই দ্বীপের মাঝে আবার ৩ টা ছোট ছোট দ্বীপের মত যায়গা আছে। এখানে কিছু গাছ আছে। সেখানে হালকা ছায়া পাওয়া যায়। বাকি পুরোটা পথ একেবারে বিরান। এই তীব্র রোদের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের অবস্থা তখন বেশ খারাপ। গাছ আছে এমন যায়গায় কিছু অস্থায়ী বাংকারের মত দেখলাম আমরা। যদিও এগুলো পরিত্যক্ত হয়ে আছে। এর ভিতরেই আমরা কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নিলাম। আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমরা বাংলাদেশের একবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেলাম। এই যায়গায়টায় কোন মাটি নেই। পুরোটাই দ্বীপের পাথর। আর পাথর গুলো ভীষণ পিচ্ছিল। এই জন্য আমাদের বেশ সাবধানে হাঁটতে হচ্ছিল। শেষ প্রান্তে বসে আমরা অনেক গুলো ছবি তুললাম। পাথরের উপর বসে ছবি তুলতে গেল আরিয়ান। আরিয়ান যে পথরটায় বসেছিল, তার উপর সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল। তাই আরিয়ান ছবি তোলার আগেই ওর কোমড় পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেল পরের ঢেউ আসার সাথে সাথেই। এই আধো ভেজা শরীর নিয়েই আরিয়ান আমাদের সাথে হাঁটতে শুরু করল।

যাদের রেখে এসেছিলাম হোটেলে, ফেরার পথে তাদের সাথে দেখা। ওর ইজি বাইকে করে ছেঁড়া দ্বীপ ঘুরতে এসেছে। ওদের সাথে একটা গ্রুপ ছবি তুলে আমরা আবার সেন্ট মার্টিনের দিকে চলে এলাম। এবার আমরা দ্বীপের পূর্ব দিকে আগাতে থাকলাম। এই দিকটা প্রায় ফাঁকা। তেমন কোন ঘর-বাড়ি নেই। তবে পাথর অনেক এদিকে। এদিকে হাঁটার সময়, কিছু সময় পর পর সাদা মেঘ এসে সূর্যকে ঢেকে দিচ্ছিল। তখন সাগরকে দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। এভাবেই কিছুক্ষণ চলার পর দেখলাম দুইটা ছোট ছেলে একটা ছোট দোকান খুলে বসেছে। সেখানে কিছুক্ষণ বসে পানি, মুড়ি খেতে খেতে নিজেদের মাঝে কথা বলছিলাম। সিফাত স্থায়ীয় ভাষায় ওই ছেলে দুইটার সাথে বেশ কিছু কথা বলল। তার বেশির ভাগই আমরা ভইঙ্গারা (চট্টগ্রামের বাইরের মানুষকে ওরা ভইঙ্গা বলে) বুঝলাম না। চলে আসার সময় একটা ছেলে সিফাতকে বলল, দোয়া হরিও বদ্দা।

ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে (ছবিঃ সাজ্জাদ, তৃষা, রাশেদ, অমিত স্যার)

এক পাশে সাগর আরেক পাশে সেন্ট মার্টিনকে সাথে নিয়ে হাঁটতে ভালই লাগছিল। এখানে সাগরের মাঝে কোন নৌকা ছিল না। যার ফলে সাগরের দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, কিছুদূর গিয়ে সাগর যেন হুট করে বাকা হয়ে গিয়েছে। ফ্ল্যাট আর্থ থিউরি (Flat Earth Theory) যারা বিশ্বাস করে এদের জন্য আদর্শ একটা যায়গা। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আমরা বড় পাথরের উপরে বসে পড়তাম। এই সময় এসে আর নিজেদের মাঝে কথাও খুব একটা বলছিলাম না। শুধুই হাঁটছিলাম আর মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। আরও বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর আরও একটা দোকান পেলাম। এখানেও সেই আগের মত কিছু খাওয়ার পর, ডাবের দাম শুনলাম। শুনে আর খাওয়ার ইচ্ছা রইল না। একটা গড়পড়তা ডাবের দাম ২৫০ টাকা। আর একটু ভালো গুলোর দাম ৩০০ টাকা। এত টাকার জন্য পুরো সেন্ট মার্টিনে থাকাকালীন ডাব খাওয়া আর হয় নি। এই পুরো পথটা জুড়ে সব সময় মানুষের দেখা না পেলেও, কুকুর ছিল প্রচুর। সেন্ট মার্টিন জুড়ে প্রচুর কুকুর দেখা যায়। কারণ জানি না। যখন আমরা প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছি তখন দেখলাম হুমায়ুন আহমেদের বাড়ি। সেখানে মনে হয় এখন হোটেলের মত থাকার ব্যবস্থা আছে। তার সামনে কয়েকটা ছবি তুললাম। এই বাড়িটি আমাদের হোটেলের খুব কাছেই। তাই এখানে এসে পিয়াস হোটেলের দিকে চলে গেল। আমরা হাঁটতে থাকলাম জেটি ঘাটের দিকে। আরও ঘন্টাখানেক হাঁটার পর আমরা জেটিতে পৌঁছাই। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে যাই মাছ কিনতে। রাতে মাছ দিয়ে বার্বিকিউ করা হবে। ভালো মত খুঁজে দুটো মাছ কিনে ফিরে যাই হোটেলে।

এই মাছদ্বয়ের বার্বিকিউ সম্পন্ন হয়

হোটেলে গিয়ে গোসল দিয়ে বিশ্রাম নিই কিছুক্ষণ। সন্ধ্যার দিকে বার্বিকিউ করার জন্য মাছ গুলো পাঠিয়ে দেওয়া একটি হোটেলে। আর আমরা এই ফাঁকে আয়োজন করি একটা ছোট্ট খেলার। এখন ফেসবুকে কিছু রিলস দেখা যায়, যেখানে একজনের চোখ বাঁধা থাকে। আর বাকি সবাই পায়ের নিচে বাশি বেধে হাঁটে। আর চোখ বাঁধা লোক একটানা মেরে যায়। এই খেলাটাই আয়োজন করা হয়। এই আয়োজন পুরোটাই করে আমাদের বন্ধু রাশেদ। কিন্তু এই খেলা চলার মাঝেই আমরা কয়েকজন মিলে রাশেদকে ধরাশায়ী করার জন্য, গোপনে বালিশ নিয়ে হামলা করার পরিকল্পনা করি। পরিকল্পনা কার্যকর শুরু হয় যখন রাশেদকে চোখ বাঁধা হয়। এরপর শুরু বালিশ দিয়ে হামলা। রাশেদ বালিশ দ্বারা অতিরিক্ত মার খেয়ে, একটা সময় রাগ করে সব খুলে চলে যায়। আমরা বাদে কেউ জানি না যে এই রাগ ক্ষণস্থায়ী। এই ফাঁকে ফাহিম রাশেদের রাগ করা অবস্থায় দুইটা ছবি তুলে রাখে। এটা নিয়ে পরে অনেক হাসি-তামাশা চলে। আর এই ফাঁকে আমরা বাকিরা সবাই রাশেদকে তুলে নিয়ে চলে আসি রুম থেকে। খেলা আবার শুরু। এই খেলা শেষে, পুরস্কার বিতরণ শুরু হয়। আগের দিনের Uno আর আজকের মারামারির মাঝে সেরাদের পুরস্কৃত করা হয়। এরপর খাওয়া দাওয়া শুরু হয়।

পুরস্কার বিতরণী চলছে

আজই ছিল আমাদের ট্যুরের শেষ দিন। কালকে দুপুরেই আমাদের জাহাজ। তারপরও সবাই নিজের মতই কিছু করছিল। কেউ একজন এই কম আলোতেও দেখলাম বই (গল্পের) খুলে পড়তেছে। কিছু লোক আজকেও Uno খেলতে বসে গেছে। এর মাঝে আমি কোন কাজ না পেয়ে একটা ঘুম দিলাম।

সকালে উঠে মনে হলো আজকে আর কোন ঘুরাঘুরি নেই। আর সবাই ক্লান্ত থাকায় সবাই রুমেই শুয়ে ছিলাম। এর মাঝে কয়েকজন খুবই উৎসাহী হয়ে আবার সাগরে গেলো গোসল করতে। ফিরে এসে এরা ভালই ঝামেলায় পড়লো। একে ত ওয়াশরুম কম, এর মাঝে আমাদের বের হতে হবে। তাই লাইন ধরে গোসল দিল। আমরা দ্রুত বের হয়ে গেলাম জেটি ঘাটের দিকে। সেখানে খেয়ে জাহাজ ধরতে হবে।

খাওয়ার পর ধীরে ধীরে জাহাজে উঠলাম সবাই। এটা সেই আগের জাহাজটাই। আজকে আমরা সিটে বসে রইলাম খুবই কম সময়। এদিন আমরা পুরোটা সময় জাহাজের সামনে বসে এসেছি। মাঝে বাংলাদেশের কোন খেলা ছিল, তাও খানিকটা সময় ফাহিমের ফোনে দেখা হলো।

আমরা টেকনাফ ফিরলাম সন্ধ্যার দিকে। এখানে আমাদের জন্য বাস অপেক্ষা করছিল। বাসে করে চলে গেলাম ঈদগাহ।

ঈদগাহ

ঈদগাহ হলো কক্সবাজারের একটি উপজেলা। এখানেই আমাদের সিফাতের বাড়ি। আজকে ওর বাড়িতেই দাওয়াত। কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার সময় আমরা তাই এখানে দাঁড়ালাম। বাস থেকে ইজি বাইক নিয়ে চললাম সিফাতদের বাড়ি। বাস যেখানে নামিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে সিফাতের বাসা বেশ দূর। বেশ কিছুক্ষণ লাগলো ইজি বাইকে করে যেতে।

সিফাতদের বাড়ি একতলা। আন্টি, আংকেল দুইজনই স্কুল টিচার। বাড়ির সামনেই বেশ কিছু গাছ আছে। বাড়ির পাশে নাকি নিজেদের মুরগির ফার্মও আছে। রাত হয়ে যাওয়ায় এতকিছু দেখা হয়নি। বাড়িতে ঢুকেই ফ্রেশ হলাম সবাই। আন্টি প্রচুর খাবার রান্না করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এত দিন বাইরে ঘুরাঘুরির ফলে মুখে রুচি বলে কিছু নেই। তেমন কিছু খেতে পারলাম না আমি। ফেরার পথে, সিফাত থেকে গেলো। আমরা বাকিরা বাসে উঠে ঢাকার পথে রওনা হলাম।

সিফাতের বাসায় (কক্সবাজার)

কক্সবাজার → ঢাকা

বাসে উঠার পর কিছু মনে নেই আমার। পুরোটা পথ শুধু ঘুমিয়েছি। এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে বাস ঢাকায় প্রবেশ করার পর ঘুম ভেঙেছে। আমাদের বাস সায়েদাবাদ সবাইকে নামিয়ে দেয়। এরপর সবাই যে যার মত বাড়ির দিকে চলে যায়। এর মাঝে আমি, সাজ্জাদ আর মেফতা শুধু খুলনায় চলে আসি। আমাদের সাথে অবশ্য অমিত স্যার এবং বশির স্যারও আসে।

৬ তারিখ সকালে BCSIR-এ আমাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর শুরু হয়। এরপরের দিন মানে ৭ তারিখ রাত থেকে আমাদের র‍্যাগ ট্যুর শুরু হয়। যা শেষ হয় ১৪ তারিখ সকালে ঢাকায় পৌছে। এই সময়টার হাজারো স্মৃতি নিয়ে আমরা যে যার মত ফিরে যাই নিজের গন্তব্যে। আজ প্রায় ২.৫ বছর হয়ে গেছে র‍্যাগ ট্যুরের, কিন্তু এখনো মনে হয় সেদিনই ত গেলাম। এই ট্যুরের একেকজনের গল্প একেকরকম হবে। আমি শুধু আমারটাই বলতে পেরেছি। তাই দেখা যাবে, আমার এই গল্পে অনেকেই নাই। কিন্তু প্রত্যেকেই নিজের মত করে একটা গল্প তৈরি করছে এই ট্যুরে, যেটা সে সারা জীবন নিজের মাঝে বয়ে বেড়াবে।

— নিলয়

বিঃ দ্রঃ ছবির এলবাম যুক্ত করা আছে শেষে। চাইলে দেখতে পারেন।

বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর preview 1বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর preview 2বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর preview 3বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর preview 4

Photos

বিএমই '১৮ র‍্যাগ ট্যুর

আমাদের র‍্যাগ ট্যুর

// Newsletter

Get New Blog Updates

Join the list and I will email you when a new post goes live.

← All PostsPortfolio →